রবিউছ ছানী ১৪৪৫ হিঃ

হযরত আলী নাদাবীর পাতা

হযরত মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নাদাবী রহ-এর মধ্যপ্রাচ্যসফরের রোযনামচা

ডাক দিয়ে যায় মুসাফির!- ৮

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

১৪/৫/১৩৭০ হি. ২০/২/১৯৫১  খৃ.

মুহম্মদ ফরীদ আব্দুল খালিকের দাওয়াত: যোহর পর্যন্ত লেখা ও সম্পাদনার কাজে ব্যস্ত ছিলাম। যোহরের পর উস্তায মুহম্মদ ফরীদ আব্দুল খালেকের দাওয়াতে শরীক হওয়ার জন্য তার বাড়ি গেলাম। সঙ্গে ছিলেন ভাই ইয়াসীন ও শায়খ ওবায়দুল্লাহ্। সৌভাগ্যক্রমে সেখানে দেখা হলো শায়খ মুহম্মদ গাযালী ও আব্দুল হাফীয ছায়ফীর সঙ্গে। সেখানে তৃতীয়জন ছিলেন কায়রো বিশ^বিদ্যালয়ের আইন অনুষদের প্রফেসর ড. তাওফীক শাবী। সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ ছিলো। তাই বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা উঠলো। আমিও তাতে স্বতঃস্ফ‚র্ততার সঙ্গে অংশ নিলাম। প্রসঙ্গ থেকে পসঙ্গে যেতে যেতে  তাছাওউফ এবং তার উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা শুরু হলো। সঙ্গত-অসঙ্গত বিভিন্ন কারণে আরব-বুদ্ধিজীবী সমাজে এমনকি আহলে ইলমের মজলিসেও তাছাওউফের প্রতি একধরনের ভীতি ও অনীহা কাজ করে, যা হিন্দুস্তানের আহলে ইলমের মধ্যে দেখা যায় না। তাই প্রসঙ্গের সুযোগ নিয়ে এ বিষয়ে একটু বিশদ কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমার কথার খোলাছা ছিলো: ‘একেবারে শুরুতে ইসলামী খিলাফাত উম্মতের দু’টি মৌলিক দিকের যুগপৎ প্রতিনিধিত্ব করতো। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক এবং নীতি ও নৈতিকতা, তথা আত্মিক ও আধ্যাত্মিক দিক। খেলাফত ও খলীফার পূর্ণ দায়িত্ব ছিলো উম্মাহ্র জীবনে এদু’টি দিকের শুধু হিফাযত করা নয়, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য নিরলস কাজ করা। মোটকথা, উম্মতে ইসলামিয়ার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক, একই সঙ্গে উভয় দিকের দায়দায়িত্ব ছিলো খেলাফতের যিম্মায় এবং খলীফার কাঁধে।মূলত এই যুগপৎ দায়িত্ব ছিলো রাসূল ও রিসালাতের দায়িত্ব। তাঁর ওয়াফাতের পর এ মহান দায়িত্ব অনিবার্যভাবেই খলীফা ও খেলাফতের কাঁধে অর্পিত হয়। বলাবাহুল্য যে, হযরত আবূবকর রা. থেকে শুরু করে খেলাফতে রাশেদার নূরানী যুগ পর্যন্ত একই সঙ্গে এ উভয় দায়িত্ব মহান খলীফা সুচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন। এরপর, হঠাৎ করে নয়, বরং ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে লাগলো এবং একসময় খেলাফাত চলে গেলো অযোগ্য লোকদের হাতে, অর্থাৎ এমন লোকদের হাতে যাদের ব্যক্তিত্বে দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দিকের সুসমন্বয় ছিলো না। ফলে ঘটনা যত মর্মান্তিকই হোক, বাস্তবতা এটাই যে, দ্বীন ও শরী‘আত প্রশাসন ও রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে গেলো। তখন থেকে খেলাফত- আরো সঠিক শব্দ হবে এমারত ও হুক‚মত শুধু মুসলিম উম্মাহর জীবনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়েরই দেখভাল করতে থাকলো। সেখানে ইসলামী আইন ও বিধানের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে শিথিল হতে থাকলো। পক্ষান্তরে আখলাক ও নৈতিকতা এবং রূহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার বিষয়টি ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকলো। একসময় অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, খেলাফত ও হুক‚মতের সীমানা থেকে এটি একেবারে হারিয়ে গেলো। নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার পথে না থাকলো কোন দা‘ঈ ও দাওয়াত, না আহŸান ও আহŸায়ক। দ্বীন ও শরী‘আত এবং রূহ ও রূহানিয়াত হয়ে গেলো এমন এতীম যে, তার দেখভাল করার আর কেউ থাকলো না, না ব্যক্তি পর্যায়ে না সামষ্টিক পর্যায়ে। দুনিয়াদারি ও ভোগ-বিলাসের বস্তুবাদী জীবনের প্রভাব ও প্রতাপ এমনই অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে পড়ে যে, ধ্বস ও অবক্ষয় রোধ করার কোন উপায় আর থাকলো না। ফলে মুসলিম উম্মাহ্র অবস্থা হলো এমন যে, বস্তুবাদের সর্বব্যাপী সয়লাবে এবং নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার অবক্ষয়ের মহাবিপর্যয়ের মুখে মানুষ ও মানুষের সমাজ একেবারে ভেসে গেলো।

তখন অন্তত এই ধ্বস ও অবক্ষয় কিছু পরিমাণে হলেও রোধ করার জন্য কিছু ‘মরদে ময়দান’ ও মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ সামনে এলেন। মানুষের কাছে তাঁরা আখলাক ও নৈতিকতা এবং রূহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার দাওয়াত পৌঁছাতে লাগলেন, শুধু কথা ও বক্তব্যের মাধ্যমে নয়, বরং নিজেদের শুভ্র-পবিত্র জীবন এবং আধ্যাত্মিকতার নূর ও নূরানিয়াত দ্বারা। একই ভাবে নিজেদের খাছ ছোহবতে ও নিকট সান্নিধ্যে কিছু মানুষের তারবিয়াত শুরু করলেন, যাদের মধ্যে গ্রহণ করার যোগ্যতা ছিলো এবং যাদের ভিতরে কলব ও রূহের কিছু তড়প এবং হৃদয় ও আত্মার কিছু তাপ-উত্তাপ ছিলো। তো দীর্ঘ দিনের ছোহবত ও তারবিয়াতের মাধ্যমে তাঁরা যখন পূর্ণ প্রস্তুত হলেন তখন মুসিলম জাহানের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁদের পাঠিয়ে দেয়া হলো, যাতে আধ্যাত্মিকতার যে শিক্ষা তাঁরা এখানে পেয়েছেন, তা ঐ সমস্ত জনপদেও ছড়িয়ে দিতে পারেন। মানুষকে যেন তাঁরা আল্লাহ্র পথে ডাকতে পারেন এবং বস্তুবাদী জীবনের গতি যথাসম্ভব রোধ করতে পারেন। সুখের বিষয় হলো, তাঁদের দাওয়াত ও মেহনত বেশ সুফল দিলো এবং বস্তুবাদের আগ্রাসন কিছুটা হলেও বাধাপ্রাপ্ত হলো। হুক‚মত ও হুকুমতি ডামাডোলের আড়ালে সম্পূর্ণ নীরব ও অন্তর্মুখী সাধনার মাধ্যমে মানুষের জীবনে রূহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার যেন এক মহাবিপ্লব সাধিত হলো। বলাবাহুল্য যে, এই মহান সাধুপুরুষদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও রূহানী মোজাহাদা যদি না হতো তাহলে মুসলিম জীবন ও সমাজ বস্তুবাদের প্রবল তোড়ের মুখে সম্পূর্ণ ভেসে যেতো, যার সামনে না থাকতো কোন বাধা ও বাঁধ, না কোন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ।

 উস্তায শাবী এ বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে, নতুন প্রসঙ্গের অবতারণা করে বললেন: কিন্তু কথা হলো তাছাওউফের যা ভিত্তি ও বুনিয়াদ সেটাই তো হচ্ছে অনৈসলামী, ইসলামের সঙ্গে যার দূরতম সম্পর্কও নেই। আমি বলতে চাচ্ছি, তাছাওউফ তো বৈষম্যপূর্ণ এমন এক শ্রেণী-ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়েছে, সর্বশক্তি দিয়ে ইসলাম যা মূলশুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চেয়েছে।ছুফী ও ছুফীবাদে আমরা কী দেখতে পাই, ইসলামী সমাজে এবং মুসলিম জনপদে ছুফীরা যেন ধর্মীয় মর্যাদার অধিকারী এবং দ্বীনী সুবিধাভোগী আলাদা এক অভিজাত শ্রেণী। তারপর তাদের নিজেদের মধ্যেও রয়েছে শ্রেণীপার্থক্য। একজন শায়খ, তাঁর আবার কতিপয় খলীফা, পক্ষান্তরে আমজনতা হলো তাদের মুরীদ ও সেবক, বরং বলা ভালো, সেবাদাস। কোন কোন খানকায় তো আমি এমন অবস্থাও দেখেছি যে, পীরের গদী যেন সিংহাসন, আর পীর ‘কেবলা’ যেন বে-তাজ বাদশাহ্! তার কথাই যেন শরী‘আতের শেষ কথা। মুরীদ যেন বাজার থেকে কেনা গোলাম। তার কাজ শুধু বিনা বাক্যব্যয়ে হুজুর কেবলার আদেশ নিষেধ মান্য করা। তাছাড়া তাছাওউফের তত্ত¡কথায় আমি গ্রীক ও ভারতীয় দর্শনের ছাপ পরিষ্কার দেখতে পেয়েছি, যার সঙ্গে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।শায়খ গাজালীও কিছু কিছু বিষয়ের নিন্দা-সমালোচনা করলেন। যেমন রাজতন্ত্রের মত তাছাওউফেরও উত্তরাধিকার প্রথা। যোগ্য হোক, বা অযোগ্য, পুত্র এবং জ্যাষ্ঠপুত্রই ছাহেবযাদা এবং পিতার মৃত্যুর পর গদীনশীন পীর কেবলা। এভাবে প্রজন্ম-পরম্পরা!আমি আর কী করবো! শুধু বললাম, দেখুন! এগুলো শেষ যুগে তাছাওউফের মধ্যে ভÐ পীর-ফকিরের মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করেছে, যার দায় আপনি তাছাওউফের মূল ধারার উপর আরোপ করতে পারেন না। কারণ হযরত হাসান বছরী ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কখনো এধরনের কিছুর অস্তিত্ব ছিলো না।

আলোচনা ও মতবিনিময়ের এতটুকু সুফল হলো যে, আমরা দু’টি বিষয়ে একমত হলাম। প্রথমত, নীতি ও নৈতিকতা এবং রূহানিয়াত ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে তত্ত¡ ও প্রয়োগ উভয়দিক থেকে তাছাওউফ উম্মতে মুসলিমাহর অপরিহার্য প্রয়োজন। রূহানী ও আধ্যাত্মিক চর্চা অনুশীলন ছাড়া মুসলিম সমাজ ও জনপদকে বস্তুবাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার আর কোন উপায় নেই। দ্বিতীয়ত, রূহানিয়াতের ইছলাহ ও সংশোধনের ক্ষেত্রে তাছাওউফের যে ধারা সেটা সাময়িক ব্যবস্থামাত্র। ইসলামী জীবন যখন সঠিক অবস্থানে ফিরে আসবে এবং যখন আদর্শ ইসলামী খেলাফত কায়েম হবে এবং মহান খলীফা তাঁর প্রশাসনিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করবেন তখন আর বিভাজনের কোন প্রয়োজনই দেখা দেবে না এবং প্রয়োজন দেখা দেবে না উম্মাহর আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য কোন প্রকার সমান্তরাল ব্যবস্থা গ্রহণ করার। (আসলে এরূপ বাদানুবাদের অবতারণাই হতে পেরেছে কোরআনের শব্দ তাযকিয়া থেকে সরে গিয়ে ‘তাছাওঊফ’ এই উদ্ভট নাম ও শিরোনামের কারণে। - অনুবাদক)

আলোচনার একপর্যায়ে উস্তায বাহী আলখাওলী উপস্থিত হলেন, যিনি ইখওয়ানের তাত্তি¡ক অভিভাবক ও নীতিনির্ধারক ব্যক্তিদের একজন। তিনিও আমাদের ইলমী আলোচনায় শরীক হলেন এবং নিজের দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরলেন।তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের আমার বড় ইচ্ছা ছিলো, যা আগে থেকে সময় নেয়া ছাড়াই হয়ে গেলো। তারপর অন্তরঙ্গতাপূর্ণ দস্তরখানে আমাদের বসা হলো। দস্তরখানে এবং দস্তরখানের পরে আনন্দপূর্ণ আলাপ ও কথাবার্তা হলো। শায়খ বাহী আলখাওলীকে আমি আমার কিছু লেখা ও পুস্তিকা পেশ করলাম। তখন আগামী রোববার সকাল আটটায় সাক্ষাতের জন্য সময় নির্ধারিত হলো। বিদায়ের সময় উস্তায আব্দুল হাফীয ছায়ফী আমাকে অনুরোধ করলেন, যেন (অব.) জেনারেল ছালেহ হারব পাশার সঙ্গে দেখা করি। কারণ জমিয়তে শাবাবুল মুসলিমীনে আমার বক্তৃতার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। সুতরাং এর আগে একটু সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়ে গেলে ভালো হয়। তাতে সময় ও বিষয়বস্তু নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। তো আমরা তাঁর সাক্ষাতে গেলাম এবং কিছুসময় যাপন করলাম। হঠাৎ তিনি মিসর সম্পর্কে আমার অনুভ‚তি ও মতামত জানতে চাইলেন। আমি দ্বিধাহীন চিত্তে সুস্পষ্ট কথা বলার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং বললাম, মিসর সম্পর্কে সুদূর হিন্দুস্তানে থেকে যথেষ্ট পড়াশোনা করেছি এবং খোঁজখবর রেখেছি, তারপর এখানে এসে নিজের চোখেও সবকিছু দেখছি। যদি সত্য বলি তাহলে, তাতে আনন্দ ও স্বস্তির কিছু বিষয় যেমন রয়েছে তেমনি কষ্ট ও অস্বস্তির বিষয়ও রয়েছে। তিনিও বিশদ আলোচনার দিকে গেলেন না, আমিও আর কিছু বলা সঙ্গত মনে করলাম না। তিনি শুধু বললেন, ভৌগোলিক অবস্থান মিসরের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশী করেছে। আমি তখন শুধু এতটুকু বললাম,  আসলে ভৌগোলিক অবস্থানের চেয়ে বেশী ক্ষতি করেছে এখানকার বাণিজ্যমুখী সাহিত্য। তিনি একমত প্রকাশ করে বললেন, বাণিজ্যিক সাহিত্য বলার চেয়ে একে অশ্লীল সাহিত্য বলাই বেশী সঙ্গত। তবে সাধ্যের ভিতরে এর মোকাবেলা করার চেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। সেখানে মিসরের সাবেক বাণিজ্য  -মন্ত্রী এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যসংস্থার সদস্য মাহমূদ তাওফীক হাফনাবী উপস্থিত ছিলেন, তবে তিনি কোন কথা বলেননি, নীরব শ্রোতাই ছিলেন।

উস্তায আহমদ শিরবাছী ও তাঁর বক্তৃতা: জেনারেল ছালেহ হারব পাশার ওখান থেকে উঠে আমরা উস্তায আহমদ শিরবাছীর বক্তৃতাসভায় উপস্থিত হলাম। তিনি যেমন সুসাহিত্যিক তেমনি সুবক্তা। তাছাড়া যেমন উদ্দীপনাপূর্ণ যুবক তেমনি মিষ্টিভাষী। তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিলো ‘ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মশাসন/নিয়ন্ত্রণ। তাঁর বক্তৃতায় ভাষার জৌলুস যেমন ছিলো তেমনি বর্ণালী উপস্থাপনও ছিলো। এ বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, যখন বৈধতার উপযুক্ত কোন কারণ পাওয়া যায় তখনই শুধু ইসলাম জন্মশাসনের অনুমতি দেয়। তারপর তিনি বৈধতার কারণগুলোও তুলে ধরলেন। একপর্যায়ে তিনি বললেন, কিন্তু মিসরে বর্তমানে ঢালাও জন্মশাসনব্যবস্থার কোন প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের এখন প্রয়োজন আদরে প্রাচুর্যে পালিত কুকুরের জন্মনিয়ন্ত্রণ, যারা গাড়ীতে ঘুরে বেড়ায়, আর মৃত্যু হলে নারীরা শোকপালন ও শোকসভার অনুষ্ঠান করে। এমনকি রীতিমত কবর প্রস্তুত করে দাফন-কাফনও সম্পন্ন করে।...তিনি বক্তৃতার ইতি টানলেন একথা বলে যে, আমাদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি কোনভাবেই জন্মনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা দাবী করে না।বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর আমরা আবার জেনারেল ছালেহ হারব পাশার নিকট ফিরে গেলাম। সেখানে আমার বক্তৃতার সময় নির্ধারিত হলো বুধবার সন্ধ্যা সাতটা, আমি বক্তৃতার বিষয় নির্ধারণ করলাম ‘আজকের বিশ^ কোন পথে?

১৫/৫/১৩৭০ হি.  ২১/২/১৯৫১ বুধবার

মিসরের দারুল কুতুব গ্রন্থাগার পরিদর্শন: যোহর পর্যন্ত আমি আব্বাজান রহ. এর কিতাব جَـنَّـةُ الـمَـشْـرقِ وَمَطْـلَـعُ النُّـورِ الـمُـشْـرِق (প্রাচ্যের স্বর্গ এবং আলোর উদয়  ক্ষেত্র) নামক কিতাবের সম্পাদনাকাজে ব্যস্ত ছিলাম। কিতাবটির বিষয়বস্তু ছিলো ভারতের ভৌগোলিক অবস্থা ও অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি। ড. আহমদ আমীন, যার প্রকাশনা সংস্থা থেকে কিতাবটি প্রকাশিত হওয়ার কথা, তিনি আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন হিন্দি নামগুলোর সঠিক (ইংরেজি) উচ্চারণ লিখে দেয়ার।যোহরের পর আমরা মিসরের দারুল কুতুব গ্রন্থাগার পরিদর্শনে গেলাম। আমাদের সঙ্গে ছিলেন শায়খ আহমদ উছমান এবং জনাব রাশাদ আফেন্দী। দ্বিতীয়জন এখানে প্রায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন। এখানে বিরল পাÐুলিপির যে সংগ্রহ আছে সে বিষয়ে তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। পাÐুলিপি-গুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও    বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও তিনি ভালো জ্ঞান রাখেন। আমাদের তিনি কুতুবখানা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখালেন।এই কুতুবখানা বা গ্রন্থাগারকে মুসলিম জাহানের সবচে’ বড় ও সমৃদ্ধতম গ্রন্থাগারগুলোর একটি বলে মনে করা হয়। এখানে দুর্লভ কিছু কিতাব এবং বহু স্বনামধন্য লেখকের নিজের হাতে তৈরী করা পাÐুলিপি রয়েছে। কুছতুনতুনিয়া (ইস্তাম্বুল)র কুতুবখানাগুলো ছাড়া আর কোথাও এ কুতুবখানার তুলনা নেই। সেখানে আমি বাইহাকী, ইবনে হাজার, যাহাবী, ইবনে শাজরী ও শা‘রানীর মত মুসলিম জাহানের বরণীয় ও স্মরণীয় ব্যক্তিদের হাতের লেখা কিতাব দেখেছি।শেষ দিকে আমরা কুতুবখানার তালিকাপ্রস্তুতকারী সাইয়েদ ফুয়াদের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি আমাদের জানালেন এখানে সংগৃহীত কিতাবের সংখ্যা পাঁচলাখ।মাগরিবের কিছু আগে আমরা কুতুবখানা থেকে বের হলাম, এই ধারণা নিয়ে যে, এত সংক্ষিপ্ত সময় এমন সমৃদ্ধ কুতুবখানার শুধু পরিদর্শনের জন্যও যথেষ্ট নয়।  যদি এখান থেকে কিছু উপকার পেতে চাই তবে দীর্ঘদিন আসা-যাওয়া করা জরুরি। বাজারের একটি মসজিদে আমরা মাগরিব আদায় করলাম। সেখানে জমিয়া শার‘ঈয়্যার জনৈক সদস্যের দোকান ছিলো। তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখি, মিসরের সাবেক প্রধান মুফতী শায়খ হাসনায়ন মুহম্মদ মুখলূফ রয়েছেন! মুগ্ধ বিস্ময়ে আমরা তো আপ্লুত! এখানে তিনি, তার মত ব্যক্তি! আমরা আগে বেড়ে পরিচয়সহ দেখা করলাম। তিনি অতিশয় সৌজন্য ও বিনয়ের সঙ্গে আমাদের রীতিমত বরণ করলেন। আমাদের তিনি হালাওয়ানে দাওয়াত দিলেন এবং অত্যন্ত জোরালোভাবে বললেন, অবশ্যই যেন আমরা যাই এবং কিছু সময় তার সঙ্গে যাপন করি। আমি সঙ্গে থাকা কিছু লেখা ও পুস্তিকা তাকে হাদিয়া দিলাম।এশার পর ভাই আব্দুল্লাহ্ আকীল এবং তার এক সঙ্গী এলেন। তাদের বিদায়ের আগে আনছারুস্-সুন্নাহ্র তত্ত¡াবধায়ক মুহম্মদ আব্দুল ওয়াহ্হাব আলবান্না এবং ভাই আলী আদালী মুরশিদী এসে গেলেন। কিছুক্ষণ বসে আমাদের খোঁজ খবর নিয়ে তারপর শুভকামনা করে বিদায় নিলেন। একজন পরদেশী মুসাফিরের প্রতি এই রকমের সৌজন্যমূলক আচরণ অবশ্যই কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য এবং আমি মনে করি, আমাদের এ থেকে শেখার আছে। মিসরে সবার মধ্যে আবার এটা দেখা যায়নি। তাই কখনো মন খুশী হয়েছে, কখনো বিষণœ হয়েছে।

১৬/৫/৭০ হি, ২২/২/৫১ খৃ. বৃহস্পতিবার।

ড. আহমদ আমীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ: খুব ভোরে জনাব উস্তায রাশাদ চলে এলেন। তার সঙ্গে আমরা ড. আহমদ আমীনের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি আলেক-জান্দ্রিয়া সফরে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। ‘জান্নাতুল মাশরিক...’ কিতাবটি তাকে ফেরত দিলাম। আদর্শ সাহিত্য ও আদর্শ সাহিত্যিক সম্পর্কে তার সঙ্গে কথা হলো। আমি ঐ চারটি কিতাব সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানতে চাইলাম, আল্লামা ইবনে খালদূন যেগুলোকে আদবের মূল বুনিয়াদ হতে গণ্য করেছেন। আবূ আলী আলকালীর কিতাবুল আমালী, মুর্বারাদের আলকামিল, জাহিযের বায়ান ওয়া তিবয়ান ও ইবনে কোতায়বার আদাবুল কাতিব।তিনি বললেন, আদাবুল কাতিব তো নিরস কিতাব, পক্ষান্তরে আলকামিলের যিনি লেখক, সত্যি কথা হলো তার চয়নপ্রজ্ঞা নেই, যা সংবেদনশীল রুচি দ্বারাই শুধু অর্জিত হয়। ইকদুল ফারীদ গ্রন্থকারের মতে, কখনো কখনো তিনি অতি নি¤œস্তরের সাহিত্যখÐ চয়নিকায় তুলে আনেন। তবে এই চারের মধ্যে সবচে’ ভালো হচ্ছে বায়ান ওয়া তিবয়ান। আমি বললাম, কিন্তু তার বিন্যাসে ত্রæটি রয়েছে, যা বিক্ষিপ্ত ও ছাড়ানো ছিটানো নমুনার সঙ্কলনমাত্র, যাতে না আছে সুবিন্যাস, না পরিপাটিতা। হিন্দুস্তানের কোন কোন সাহিত্যিক বলেন, বয়ান ওয়া তিবয়ান হচ্ছে গদ্যের হামাসা। ড. আমীন বললেন, হামাসার ব্যাখ্যগ্রন্থে আলমারযূকী বলেছেন, হামাসার পোশাকী নাম হচ্ছে বায়ান ওয়া তিবয়ান। আর তার কথা যুক্তির নিকটবর্তীও। কারণ বায়ান ও তিবয়ান এবং হামাসার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য নেই।আমীনের দৃষ্টিতে জাহিযের চেয়ে আবু হাইয়্যান উত্তম | তারপর তিনি বললেন, আবূ হাইয়ান তাওহীদীকে আমি জাহিযের চেয়ে উত্তম মনে করি। কারণ (বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে) তাঁর সময়কাল ছিলো অনেক গভীর। আমি বললাম, কিন্তু জাহিযের বৈশিষ্ট্য Ñ যেমন আপনি নিজেও যোহাল ইসলামে লিখেছেনÑ এই যে, তিনি তার সময় ও সমাজের সঠিক ও বাস্তব চিত্র পরিবেশন করেছেন। তিনি বললেন, একই ভাবে আবূ হাইয়্যানও নিজের সময় ও সমাজের রূপ ও রেখা তুলে ধরেন। তারপর আবূ হাইয়ানের অন্যান্য কিতাবের আলোচনা শুরু হলো। তিনি বললেন, তার উল্লেখযোগ্য একটি কিতাব হচ্ছে ‘আলহাজ্জুল আকলী’ (বুদ্ধিবৃত্তিক হজ¦)।আমি বললাম, এ তো বড় ‘আনোখা’ নাম! হজ¦ তো এদিক থেকে ইসলামের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রোকন যে, শুরু থেকে শেষ তা প্রেম ও আত্মনিবেদন এবং ফানা ও আত্মসমর্পণ, আকল ও বুদ্ধির এখানে কোন দখল বা জবর-দখল নেই। তিনি বললেন, জি¦ হাঁ, তবে কিতাবটি আমি দেখিনি। দিলের চাহাত তো এই যে, কিতাবটি হাতে পাই এবং পড়ে দেখি, এ বিষয়ে তাঁর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি কী!

হামাসা’র ব্যাখ্যাগ্রন্থপুঞ্জ সম্পর্কে আহমদ আমীন: তারপর হামাসা’র ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলো সম্পর্কে কথা উঠলো। তিনি মারযূকীর ব্যাখ্যাগ্রন্থকে তাবরীযির উপর অগ্রাধিকার দিয়ে বললেন, তাবরীযীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ হামাসার কবিতাগুলো বোঝার ক্ষেত্রে তেমন সহায়ক নয়। তাতে যা কিছু আছে তা হলো আভিধানিক পর্যালোচনা এবং শব্দ সম্পর্কে বিভিন্ন সূ²বিষয়ের পরিবেশন। উন্দুলুসী সাহিত্য সম্পর্কেকথায় কথায় উন্দুলুসের সাহিত্যপ্রসঙ্গও এসে গেলো। আমি বললাম, উন্দুলুসের জ্ঞান ও সাহিত্যের মধ্যে সেই গভীরতা নেই যা মাশরিক ও পূর্বাঞ্চলের জ্ঞান ও সাহিত্যে রয়েছে। মাগরিব ও পশ্চিমাঞ্চলে উন্দুলুসের ইলম ও আদবকে অগভীর ও উপরিতাদোষে দুষ্ট মনে করা হয়। সেখানে জ্ঞান ও মনীষার উপর ভাষা ও সাহিত্যের প্রাধান্য দেখা যায়। ড. আহমদ আমীন আমার এই চিন্তার সঙ্গে একমত হলেন। আলোচনা শেষে আমরা এই কর্মসূচীর উপর বিদায় হলাম যে, আগামী রোববার সাহিত্য অনুষদে তার সঙ্গে দেখা করবো। তখন বিভিন্ন বিভাগ ও গ্রন্থাগার পরিদর্শন করবো।

আমরা আতাবাতুল খাযরা থেকে বের হলাম এবং জনাব আব্দুর-রাশীদ নদবীর সঙ্গে দারুল-কিতাবিল আরাবী গেলাম। এর স্বত্বাধিকারী আলহাজ হালীমী মীনাবী ছাহেব স্বাগত  জানালেন। সেখানে শায়খ মুহম্মদ গাযালী ও শায়খ বাহী আলখাওলীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে খুব আনন্দ হলো। বিভিন্ন বিষয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনা হলো। এর মধ্যে জনাব ছালিহ আশমাবীও এসে গেলেন এবং আলোচনায় যোগ দিলেন। মিসরে যে জিনিসটি লক্ষ্য করেছি তা এই যে, ইলমী মহল ও বুদ্ধিজীবী সমাজে অপ্রয়োজনীয় আলাপচারিতার পরিবর্তে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাই তাদের বেশী পছন্দ। তাতে সময়ের অপচয় ঘটে না, বরং কোন না কোন ফায়দার কথা সামনে আসে।জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে উস্তায বাহী আলখাওলীর সঙ্গে সাক্ষাৎকে নিজের জন্য আমি অত্যন্ত উপকারী মনে করি। তিনি আমার ঐ সমস্ত লেখা ও পুস্তিকা পড়ে নিয়েছেন, যা তাঁকে উস্তায মুহম্মদ ফরীদের বাসভবনে দেয়া হয়েছিলো। সম্ভবত এ কারণে এবার তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশী কদর ও সমাদরের সঙ্গে মিলিত হলেন। তখন তাঁর হৃদয় যেন ভালোবাসায় উপচে পড়া অবস্থায় ছিলো।এতে কোন সন্দেহ নেই যে,  রুচি ও চিন্তার ঐক্য এবং চেতনা ও বিশ^াসের অভিন্নতা অত্যন্ত শক্তিশালী আত্মিক বন্ধন। তিনি স্বতঃস্ফ‚র্ততার সঙ্গে বলে উঠলেন, শায়খ আবুল হাসান! তখন তো আমি আপনার ছুরত দেখেছি, কিন্তু আপনাকে চিনেছি এখন আপনার লেখা পড়ে।তিনি আমার লেখাগুলোর বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, আপনার লেখা ও পুস্তিকাগুলোর মধ্যে আমি কোন প্রকার স্থানীয় ছাপ দেখতে পাইনি এবং বিশেষ কোন শহর, জনপদ ও পারিপাশির্^কতার ছায়া অনুভব করিনি। অথচ কোন কোন লেখক চিন্তাবিদের কলমে এটা এত প্রকট থাকে যে, পাঠক সহজেই বুঝে নেয় যে, এই গ্রন্থের গ্রন্থকার ইরাকী, বা মিসরীয়। পক্ষান্তরে আপনার লেখায় আমি এই সীমাবদ্ধতা দেখতে পাইনি। আপনার চিন্তা অতি উদার ও প্রশস্ত এবং দরদপূর্ণ। আপনি বিশেষ অঞ্চল বা জনপদকে সামনে রেখে লেখেন না। আপনি লিখে থাকেন পুরো মুসলিম জাহানকে সামনে রেখে। তো আপনার লেখা ঐ স্থান ও পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত কেন নয় যেখানে বসে আপনি লিখেছেন এবং যেখান থেকে তা প্রকাশিত হয়েছে?আমি বললাম, এটা খুবই আনন্দের বিষয় যে, আপনি আমার লেখার প্রাণ ও প্রেরণা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। আমার লেখার এরূপ বৈশিষ্ট্যের কারণ সম্ভবত এই যে, আমি হিজাযে মুকাদ্দাস এবং আরব জাহানকে উদ্দেশ্য করে (এবং মুসলিম জাহানকে সামনে রেখে) লিখেছি। ভৌগোলিক অঞ্চল হিসাবে হিন্দুস্তান আমার সামনে ছিলো না।

শায়খ বাহী আলখাওলী আমার প্রতি এতটাই সহমর্মিতা প্রকাশ করলেন যে, যখন আমি আমার অবস্থানস্থলের উদ্দেশ্যে বের হলাম তখন তিনিও আমার সঙ্গ গ্রহণ করলেন। আমি আদব ও সৌজন্যবশত নিষেধ করলাম, কিন্তু তিনি জোর দিয়ে বললেন, আমি আপনার অবস্থানস্থল দেখতে চাই। মোটকথা তিনি আমার অবস্থান- স্থলে তশরীফ আনলেন এবং ঘর ও আসবাবের সাধারণতার প্রশংসা করলেন। তিনি কিছু সময় বসলেন এবং ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ্ সম্পর্কে, কতিপয় মুসলিমদেশ সম্পর্কে, আর ইখওয়ানুল মুসলিমীনের আন্দোলন সম্পর্কে অনেক কথা বললেন। তাঁর চিন্তার গভীরতা, দৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবানুগতা এবং ঈমানের শক্তি ও উত্তাপ দ্বারা আমি খুবই অভিভ‚ত হলাম। যোহরের পর আমরা শাবাবু সাইয়িদিনা মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কেন্দ্র দারুল আরকাম গেলাম। সেখানে  দেখি, ওলামা মাশায়েখের এক জামাত আমার ইন্তিযারে! তাদের মধ্যে কতিপয় আযহারী আলিম যেমন ছিলেন তেমনি আল্লামা সাইয়েদ মুবাশ্শির তিরাযী আফগানীও ছিলেন। সবার সঙ্গে পরিচয়পর্ব সম্পন্ন হলো এবং কিছু সময় বসা হলো। সাইয়েদ মুবাশ্শির তিরাযী হলেন মাওলানা  সৈয়দ সোলায়মান নদবীর অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অন্যতম। আল্লামা নদবীর প্রতি তার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা সুগভীর। তিনি বেশ কিছুক্ষণ তাঁর সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করলেন।তারপর আমরা দুপুরের দস্তরখানে শরীক হলাম।দস্তরখান থেকে ফারেগ হওয়ার পর আঞ্জুমানের বিভিন্ন শাখা এবং সেগুলোর কার্যক্রম ঘুরে ঘুরে দেখলাম।একসময় নারী আন্দোলন ও নারী বিক্ষোভ সম্পর্কেও আলোচনা হলো, যার চর্চা তখন বেশ জোরে -শোরে চলছিলো, কায়রোর তরুণীরা যার আয়োজন যথেষ্ট আপত্তিকরভাবে করেছিলো। সবাই ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করলেন এবং  আঞ্জুমানের প্রধান মিসরের প্রধানমন্ত্রীর নামে প্রতিবাদের তারবার্তার মুসাবিদা তখনি প্রস্তুত করলেন।

১৭-৫-৭০/২৩-২-৫১ জুমুআ, 

সৈয়দ কুতুবের সান্নিধ্যে: আগের থেকে নির্ধারণকৃত সময় অনুযায়ী সকাল দশটায় আমি ও মাওলানা ওবায়দুল্লাহ্ বালয়াবী ছাহেব দারুল কুতুবিল আরাবিয়্যা গেলাম। সেখানে ঐ প্রতিষ্ঠানের  স্বত্বাধিকারী হিলমী মীনাবী ও শায়খ মুহম্মদ গাযালী আমাদের ইন্তিযারে ছিলেন। আগেই কথা হয়েছিলো যে, তাদের সঙ্গে আজ আমরা সৈয়দ কুতুবের সঙ্গে দেখা করার জন্য হালওয়ান যাবো। জনাব হিলমী মীনাবী সৈয়দ কুতুবের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। আমার ধারণা ছিলো, সময় তো আগেই নেয়া হয়েছে।  এখন দেখি, সময় নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে, যা আমার রুচি ও স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু পরদেশী মুসাফিরের পক্ষে রুচি ও স্বভাবের প্রতি সবসময় সুবিচার করা সম্ভব হয় না। বোঝা গেলো, ফোনে অপর পাশে সৈয়দ কুতুবকে পাওয়া গিয়েছে। জনাব মীনাবী আনোখা এক পন্থা অবলম্বন করলেন, বললেন, আপনি কি مَـاذا خَـسِـر الـعَـالَـمُ ....পড়েছেন? ওপাশ থেকে সৈয়দ কুতুব সম্ভবত বললেন, জি¦ পড়েছি, অত্যন্ত মূল্যবান কিতাব! মীনাবী বললেন, আপনি কি এই গ্রন্থের গ্রন্থকারের সঙ্গে দেখা করতে চাইবেন? ওপাশ থেকে আগ্রহ ও উচ্ছ¡াসের সঙ্গে বলা হলো, অবশ্যই, কেন নয়! মীনাবী বললেন, আমরা তাহলে তাকে সঙ্গে করে আসছি। তিনি বললেন, আহলান ওয়া সাহলান! আমরা জনাব মীনাবীর গাড়ীতে করে হালওয়ানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। কায়রো থেকে হালওয়ানের দূরত্ব ত্রিশ কিলোমিটার। আমরা যখন হালওয়ান পৌঁছলাম, ইমাম তখন খোতবা দিচ্ছেন। আমরা জুমু‘আ আদায় করলাম। তারপর সৈয়দ কুতুবের বাসস্থানের উদ্দেশ্যে বের হলাম। দেখা গেলো, মীনাবী সৈয়দ ছাহেবের ঘর ভুলে গিয়েছেন! মানে রাহবার নিজেই পথ হারিয়েছেন! তখন শুরু হলো একে ওকে জিজ্ঞাসা করার পালা! আমার আশঙ্কা হলো, সময়ের বড় অংশ হয়ত ঠিকানা খোঁজার পিছনেই চলে যাবে। এর মধ্যে আরো অবাক হওয়ার পালা! খোদ সৈয়দ ছাহেবকেই কিনা জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তাঁর ঘরের ঠিকানা! আমাদের দুই পরদেশীর বিষয় তো ঠিক আছে, আমাদের সঙ্গে তাঁর মুখপরিচয় ছিলো না, কিন্তু এখন দেখা গেলো, মীনাবী ছাহেব শুধু ঘরের ঠিকানাই ভুলেননি, মানুষটির চেহারাও ভুলে গিয়েছেন! সময়ের পর্দা আসলেই বড় কঠিন। মীনাবী ছাহেব, তার ভুলে যাওয়ার জন্য দুঃখপ্রকাশ করলেন, আর সৈয়দ ছাহেব মৃদু হেসে তার পিঠে হাত রাখলেন, যেন এটা তেমন কোন বিষয় না! তাঁর আন্দাযটি ছিলো বড় সুন্দর।সৌজন্যবিনিময়ের পর আমি বললাম, আমার কাছে আপনার নামে জনাব আব্দুল গফ‚র আত্তারের পরিচিতিপত্র ছিলো, দুঃখের বিষয়, ভুলে তা ঘরে রেখে এসেছি। তিনি বললেন, কলমের গুণে এখন তো আপনি নিজেই আপনার পরিচয়। আমি বললাম, তিনি আপনাকে খুব মহব্বত করেন, খুব ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনার কথা বলেন। সৈয়দ ছাহেব বিনয়ের হাসি হেসে বললেন, এটা হলো তাঁর মুহব্বতের নতিজা। আর মুহব্বতের কথার মধ্যে পূর্ণ বিশ^াসযোগ্যতা থাকে না। কিছু না কিছু অতিশয়তা এসেই যায়।

সৈয়দ কুতুবের জীবনের মোড়- পরিবর্তন: আমি তাকে বললাম, আপনাকে আমি আব্বাস মাহমূদ আক্কাদের ‘চিন্তাশিবিরের’ একজন বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক হিসাবেই জেনে এসেছি। রিসালাহ্ পত্রিকায় আপনার বিভিন্ন গবেষণাপত্র এবং সাহিত্যবিষয়ক সমালোচনাপ্রবন্ধ নিয়মিতই পড়তাম। তো এই ইসলামী সাহিত্যের দিকে আপনার ঝোঁক কখন কীভাবে তৈরী হলো?তিনি বললেন, এটা তো ঠিক যে, সাহিত্য ও সাহিত্যশৈলীর ক্ষেত্রে আক্কাদ আমার মান্যবর। শব্দচর্চার চেয়ে চিন্তাচর্চার প্রতি তিনিই আমার মনোনিবেশ ঘটিয়েছেন। ফলে শব্দমুখিতার পরিবর্তের আমি চিন্তামুখী হতে পেরেছি, এজন্য আক্কাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। লেখার ক্ষেত্রে আমার মধ্যে ছাদিক রাফে‘ঈ ও মানফুলূতীর প্রভাব ছিলো এবং যথেষ্ট ছিলো, তিনিই আমাকে নতুন দিকনির্দেশ করেছেন। এখানে যে কথাটি আমি বলতে চাই তা এই যে, সাহিত্য ও সমালোচনা এবং নিছক কাব্যরুচি থেকে সরিয়ে যে জিনিসটি আমাকে আমার বর্তমানে নিয়ে এসেছে তা হলো আমার নিজের স্বভাব ও ফিতরত এবং আমার প্রকৃতিগত নিজস্ব রুচিবোধ। আমার অন্তর্চিন্তা সবসময় কলব ও রূহ এবং হৃদয় ও আত্মার সন্ধানে ছিলো। আত্মার জগতের সব-কিছুর প্রতিই ছিলো আমার স্বভাব -আকর্ষণ। সমাজে জনপদে যাদের পরিচয় হলো বুযুর্গানে দ্বীন তাঁদের অবস্থা ও ঘটনাবলী এবং তাদের বুযুর্গি ও কারামাতের আমি খুব ভক্ত ও আসক্ত ছিলাম। কোন কোন ঘটনায় আমার দিল খুব নরম হতো, আর চোখে পানি আসতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভক্তি ও আসক্তি আমার মধ্যে নিবিড় ও গভীর হতে থাকলো। আক্কাদ শুধু বুদ্ধিবাদী মানুষ ছিলেন। প্রতিটি বিষয় তিনি বুদ্ধির নিক্তিতে মাপতেন এবং চিন্তার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করতেন। বুদ্ধি-ঊর্ধ্ববিষয়কেও এ আলোকেই তিনি আলোচনা পর্যালোচনা করতেন। তাই সাহিত্যচর্চা ও কলমচালনায় আমি আক্কাদের সঙ্গে থাকলেও আমার কলব ও রূহের যে চাহিদা, আমার হদয় ও আত্মার যে পিপাসা এবং আমার স্বভাব-রুচির যে আকুতি, তা আমি অন্যান্য উৎস থেকে পরিতৃপ্ত করে চলেছিলাম, যে উৎসগুলো আমার মনে হতো হৃদয় ও আত্মার বেশী কাছে। এরই ফলে ‘ট্যাগোর’ ও তার মত কবিদের কাব্য অধ্যয়নে আমি মনোযোগী হলাম। দ্বিতীয় বিষয় এই যে, আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিলো, আক্কাদের মত আকল-বুদ্ধির অনুসারী, বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষ যারা, সময়ের সাময়িক সুবিধা ও চাহিদার সামনে তাঁরা ‘নরম’ হতে পারেন না এবং শাসক-শক্তির কাছে মাথা নত করতে পারেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নরম হলেন এবং সমঝোতা করে নিলেন! হয়ত এর কারণ, তিনি খুব বুড়ো হয়ে গিয়েছেন, আর বার্ধক্যে মানুষ ঐ সমস্ত চাপ বরদাশ্ত করতে পারে না, যৌবনের উচ্ছল শক্তিতে যা সহ্য করা কঠিন মনে হয় না। কয়েক বছর থেকে বার্ধক্যের সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে অর্থসঙ্কট। সম্ভবত এগুলোই তাঁকে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথে নিয়ে এসেছে।

আমি জানতে চাইলাম, আক্কাদ, যার সম্পর্কে আশঙ্কা ছিলো যে, তিনি কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়বেন, তিনি এর বিপরীত শিবিরে কীভাবে এসে গেলেন? তিনি বললেন, বার্ধক্য ও সঙ্কট তো ছিলোই, তদুপরি তিনি মনে করতেন, কমিউনিজম মানুষের চিন্তা ও বুদ্ধির উপর পাহারা বসিয়ে দেয়, বরং তা দমন করার চেষ্টায় লেগে যায়। মুখের ও কলমের স্বাধীনতা অস্বীকার করে এবং যে কোন নতুন চিন্তা প্রকাশের অধিকার প্রত্যাখ্যান করে। কমিউনিজম আত্মিক মূল্যবোধ এবং আধ্যত্মিক পথ ও মত সমর্থন করে না। দ্বিতীয় কারণ, মিসরে যারা কমিউনিজমের বক্তা ও প্রবক্তা, তাদের কেউ কেউ এর ভুল প্রতিনিধিত্ব করেছে। আমি বললাম, আধ্যাত্মিকতা ও আত্মিক মূলবোধের প্রতি তাঁর আগ্রহ এখানে কোত্থেকে এলো! তিনি তো আগাগোড়া বুদ্ধিবাদী মানুষ! সৈয়দ কুতুব বললেন, আক্কাদ ‘আচার-সমাচার’ পর্যন্ত আধ্যাত্মিক -তার বিরোধী নন। কেউ আত্মিক মূল্যবোধের প্রতি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, এতে তিনি সম্মত নন।

 সৈয়দ কুতুবের গ্রন্থাবলী: আলোচনায় তার বিভিন্ন রচনা ও কিতাবের প্রসঙ্গ উঠে এলো, যেমন العَدالَـة الاجْـتِـماعِيَّـة فـي الإسلام(ইসলামের সামাজিক সুবিচার)¡التَّـصْويـرُ الـفَـنِّـي فـي الـقُـرآن(কোরআনে শিল্পসৌন্দর্যের চিত্রায়ণ)مَـشاهِـدُ الـقِـيـامَـة فـي الـقُـرآن(কোরআনে কিয়ামতের দৃশ্যায়ন)তিনি ঐ সমস্ত কারণ ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেন যা তাকে এগুলো লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি এও বললেন, শুধু চিন্তা থেকে ইসলামী চিন্তার দিকে কীভাবে তাঁর অগ্রযাত্রা হলো এবং কীভাবে ইসলাম সম্পর্কে তাঁর অধ্যয়ন ও গবেষণা গভীর ও বিস্তৃত হলো। তাঁর লেখা ও কলম সম্পর্কে যে সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে, ইচ্ছা হলো সে আলোচনা তুলি, কিন্তু পরিবেশ ও সময় তার উপযোগী মনে হলো না, তাই নিজেকে তা থেকে বিরতই রাখলাম। দুপুরের দস্তরখান তাঁর সঙ্গেই গ্রহণ করা হলো। তারপর আছরের জামাত করে আমরা রওয়ানা হলাম এবং মাগরিবের আগে আগে কায়রো পৌঁছে গেলাম।

কল্পনা থেকে বাস্তব কত দূরে! চিত্তাকর্ষক বিষয় এই যে, কল্পনায় সৈয়দ কুতুবের আকার অবয়ব ও তাঁর দর্শনরূপ সম্পর্কে আগেই আমি একটি চিত্র এঁকে রেখেছিলাম। সাধারণত এটা আমি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে করি, বিশেষ করে ঐ সমস্ত ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যাদের আমি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশিষ্ট মনে করি। জানি না, অন্যরাও এমন করে কি না। তবে আমি করি, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এখানেও তাই হলো এবং বেশ মোটাদাগেই হলো। আমি ভেবেছিলাম, ত্রিশ থেকে চল্লিশের মাঝে হবেন; সুঠাম দেহ, প্রশস্ত বুক এবং রাশভারী প্রকৃতির সাহিত্যিক। কিন্তু বাস্তবে দেখি, বয়স ত্রিশেরও কম! উচ্চতায়ও বেশী নন! কায়রো বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাপ্ত। তাঁকে দেখে এ অনুমান করা কঠিন যে, ইসলাম সম্পর্কে কলমচালনার ক্ষেত্রে তিনি এমন শক্তিশালী ও গতিশীল ধারা ও শৈলীর প্রবর্তক। তাঁর কথাবার্তা ও আলাপ আলোচনা থেকে বুঝলাম, তিনি স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট চিন্তা-ভাবনার অধিকারী। আপন চিন্তা ও চেতনার প্রতি তিনি পূর্ণ বিশ^স্ত ও প্রতিশ্রæতিবদ্ধ।

শনিবার, ১৮-৫-১৩৭০ হি./২৪-২-১৯৫১ খৃ. 

সৈয়দ কুতুবের একটি কিতাব অধ্যয়ন: সকালে তেলাওয়াতের পর কিছু সময় নিজেকে লেখার কাজে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু যাকে বলে লেখার প্রবাহ, সেটা এলো না। তাই যোহর পর্যন্ত সৈয়দ কুতুবের কিতাবمَـعْـركـة الإسلام والرَّأسُمـالِـيَّـةِ(ইসলাম ও পুঁজিবাদের সঙ্ঘাত) অধ্যয়ন করলাম। কিতাবের মধ্যে লেখকের কলমের তেজস্বিতা ও গতিময়তা, ঈমানের জোর ও জোয়ার এবং ইসলামের হয়ে কথা বলার নির্ভীক উপস্থাপন আমার খুব ভালো লাগলো। এটি ইসলামের নতুন সফলতা যে, নিজের বাণী ও বার্তা এবং পায়গাম ও বক্তব্য পৌঁছানোর জন্য ইসলাম এমন একজন ‘যাদুবয়ান’ সাহিত্যিক ও তেজস্বী লেখকের কলম নিজের অনুগত করে নিয়েছে।

হোসায়ন ইউসুফের সঙ্গে: যোহরের পরও লেখাপড়ায় ব্যস্ত ছিলাম। জনাব হোসায়ন ইউসুফ ও জনাব আব্দুল ওয়াহ্হাব আছরের সময় আসার ওয়াদা করেছিলেন, তবে তারা এলেন বিলম্ব করে মাগরিবের পর এবং থাকলেন রাত নয়টা পর্যন্ত। তাদের সঙ্গে মিসরের নৈতিক অবক্ষয় ও তার প্রতিকার সম্পর্কে আলোচনা হলো। তারা আমাকে জানালেন, শিক্ষামন্ত্রীর ছত্রচ্ছায়ায় শিক্ষাবিভাগের কতিপয় বিবেকহীন ব্যক্তি কীভাবে জোর প্রচারণা চালিয়েছিলেন এবং ডাক দিয়েছিলেন, যাতে মিসরের প্রত্যেক শহরের তরুণ-তরুণীরা একযোগে মশাল মিছিল বের করে। আর কায়রোতে যেন সবচে’ বড় সমাবেশ হয়। এর ফল এই হলো যে, মধ্যরাতের নগ্নতা, বেহায়াপনা ও বেলেল্লাপনা, সর্বোপরি আবরু লুণ্ঠনের এমন ‘বাজার গরম’ হলো যে, লজ্জা-শরমও মুখলুকোবার জায়গা পায়নি। এমনকি ‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ নামে নিয়মিত বিরতিতে এটা শুরু হয়ে গিয়েছিলো।মিসরের সমাজ ও যুবসমাজের প্রতি যাদের দিলে দরদ-ব্যথা ছিলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে তারা অস্থির হয়ে পড়েছিলেন।অবশ্য পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যাওয়ার আগেই শাবাবে সাইয়েদিনা মুহম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামলো। বিভিন্নভাবে তারা এই নৈতিকাবিধ্বংসী ও শরমহায়াবিনাশী কর্মকাÐের প্রতিবাদ জানালেন। বাদশাহ্র নামে অসংখ্য তারবার্তা পাঠালেন। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নাকরাশি পাশা। বাদশাহ্ অবিলম্বে এ বিতর্কিত কর্মকাÐ বন্ধ করার ফরমান জারি করলেন। এভাবে বিশেষ কোন আন্দোলন-আলোড়ন ও সঙ্ঘাত-সঙ্ঘর্ষ ছাড়াই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলো। কারো ব্যক্তিচরিত্রে বা ব্যক্তিগত বিষয়ে হামলা করার বিষয়ে আমি নিজের মত প্রকাশ করে বললাম, এটা থেকে বেঁচে থাকা খুব জরুরি। মিসরীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে তারা এর প্রয়োজন ও অনিবার্যতা তুলে ধরলেন এবং উপকারিতাও বললেন। আমরা উভয় পক্ষ নিজ নিজ যুক্তিপ্রমাণ পেশ করলাম, তবে পূর্ণ একমত হওয়া গেলো না। শেষে একথার উপর কথা শেষ হলো যে, এ বিষয়ে সতর্কতা ও সংযম রক্ষা করা অবশ্যই দরকার, বিশেষ করে বিতর্ক ও সমালোচনার ক্ষেত্রে সংযম ও ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা থেকে সরে আসা কিছুতেই উচিত নয়। কথা তো হলো, কিন্তু কথা হলো, কোন ব্যক্তি বা সমাজ যে স্বভাব, রুচি ও প্রকৃতির উপর গড়ে ওঠে তা থেকে খুব একটা বের হয়ে আসতে পারে না। হাঁ, যদি পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ব্যাপক সংস্কার ও সংশোধন শুরু হয়, আর হেকমত ও প্রজ্ঞার পথে চলতে থাকে তাহলে একসময় হয়ত স্বভাব ও প্রকৃতিরই পরিবর্তন ঘটে যায়। বৃহস্পতিবার রাতে দারুল আরকামে যাওয়ার ওয়াদা আছে। ইনশাআল্লাহ্ সেখানে ‘পাক-ভারত উপমহাদেশে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত ও তার নতীজা বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা পেশ করবো। প্রকৃত সত্য এই যে, হিন্দুস্তানে দাওয়াতি মেহনত প্রচেষ্টার এই যে নতুন তাজরাবা ও অভিজ্ঞতা, এর সঙ্গে আরবদের পরিচয় হওয়া খুবই জরুরি। কারণ এখানে সবই আছে, ঈমান আছে, জোশ ও জযবা আছে এবং ত্যাগ ও কোরবানির উদ্দীপনা আছে, শুধু একটু বাস্তব নমুনা তুলে ধরার প্রয়োজন যা তাদেরকে সঠিক পথের দিকে নিয়ে যাবে। নইলে খুবই আশঙ্কা হয় যে, নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ উদ্দীপনা ভুল পথে পরিচালিত, আর উম্মাহ্র সম্পদ হতে পারতো তাই হয়ে যাবে উম্মাহর জন্য ক্ষতির কারণ।   

(চলবে ইনশাআল্লাহ্)


** আমাদের জন্য অনুকরণীয়:  আমাদের প্রাণপ্রিয় হযরত আলী মিয়াঁ রহ. জীবনের সেই শুরু থেকে দুনিয়ার বিচারে যাদের বড় ভাবা হয়, তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা করেছেন, দ্বীনের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের কাছে গিয়েছেন, কিন্তু তাদের কাছ থেকে কখনো দুনিয়ার সামান্য ফায়দাও গ্রহণ করেননি; ব্যক্তিগতভাবে তো নয়ই, এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নদওয়ার নামেও না। একবার তো তিনি কুয়েতে অবস্থানকালে সউদী আরবের হজ¦মন্ত্রী পায়গাম পাঠালেন, এতদূর যখন এসেছেন, আমি দাওয়াত করছি, আমার মেহমানরূপে হজ¦পালন করে যান!তখন তাঁর যিয়ারাতে বাইতুল্লাহ্র দীর্ঘ দশবছর হয়ে গিয়েছিলো। তিনি অস্থিরও ছিলেন যে, ‘ডাক’ কেন আসছে না! কোন বেআদবী হয়নি তো! এমন অস্থিরতার সময়ও তাঁর মনে হলো, হজ¦মন্ত্রীর দাওয়াত আসলে আসমানের ইমতিহান ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলে পাঠালেন, কোন বান্দার অনুগ্রহ গ্রহণ করে আল্লাহ্র ঘরে যাওয়া আমার ইচ্ছা নয়! গেলেন না! তারপর এমন গায়বি ইন্তিযাম হলো যে, প্রতিবছরই মর্যাদার সঙ্গে বাইতুল্লাহ্র যিয়ারাত নছীব হতে থাকলো।

শেয়ার করুন:     
প্রিন্ট

অন্যান্য লেখা