শিশু-কিশোর ও নবীনদের পত্রিকা

মাসিক আল-কলম-পুষ্প

মুহররম.১৪৪০হিঃ (৩/৬) | তোমাদের পাতা

কিছু সময় লেখক ওসম্পাদকের সান্নিধ্যে!

প্রিয় পাঠক, তোমার কার কী উপলব্ধি, জানি না; আমি নিজের উপলব্ধির কথা বলছি-হৃদয়ের কোমলতা ও ¯তা, রাতের নির্জনতায় ও নৈশব্দে যেমন করে অনুভূত হয়, দিনের কোলাহল ও সমাগমের মধ্যে তেমন করে অনুভূত হয় না। হৃদয় যখন কোমল ও ¯গ্ধ হয় তখন পরম সত্তার প্রতি আত্মনিবেদনের সুন্দর একটি মিনতি জাগ্রত হয়; আর তখন মানুষের প্রতি কল্যাণকামনার একটি আকুতি উদ্বেলিত হয়। হৃদয়ের কোমলতা গ্ধতা ছাড়া এটা হয় না। রাতের নির্জনতা ও নিঝুমতার সঙ্গে, প্রিয় পাঠক, তোমার যদি পরিচয় থাকে, আমার এ উপলব্ধি, আশা করি, তোমার অন্তরও গ্রহণ করবে। প্রিয় পাঠক! আমার ছোট্ট পরিসরে রাত এখন নির্জন ও নিঝুম! হৃদয় আমার এখন কোমল ও ¯গ্ধ এবং সিক্ত ও বিগলিত। তাই আমার ক্ষুদ্র সত্তা এখন পরম সত্তার প্রতি আত্মনিবেদনের জন্য আকুল ও ব্যাকুল!! আলোকময়তার এ দুর্লভ মুহূর্তে, প্রিয় পাঠক, তোমাকে মনে না পড়লেই হয়ত ভালো ছিলো। ঊর্ধ্বজগতের এ আলোকপ্রবাহে অবগাহন করা হয়ত তখন সহজ হতো।কিন্তু তোমাকে আমার মনে পড়লো এবং তোমার প্রতি কল্যাণকামনার আকুতি আমাকে এমনই আচ্ছন্ন করলো যে, আলোকপ্রবাহের এ অবগাহনে তোমাকেও াত করার জন্য কলম হাতে নিতেই হলো, ‘আলোকিত পর্দা’র সামনে বসতেই হলো।যদি বলি, এসো, কিছু সময় আমার সঙ্গ গ্রহণ করো, বিরক্ত হবে না তো?! এসো তাহলে, বসো আমার পাশে। আশা করি, তোমার কিছু সময়ের সঙ্গ আমাকে কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ করবে এবং আমার কিছু সময়ের সান্নিধ্য একটু হলেও তোমাকে ¯তা দান করবে, যদি এসময়টুকু আমরা পরম সত্তার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদন করতে পারি।***প্রিয় পাঠক! প্রত্যেক মানুষের ভিতরে বিভিন্নমুখী সত্তা বিরাজ করে। আমার মধ্যেও, তোমার মধ্যেও। বহু সত্তার মধ্যে আমার ভিতরের চারটি সত্তা আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তার মধ্যে প্রসঙ্গের অনুরোধে দু’টি সত্তার কথা এখানে উল্লেখ করবো। প্রথমটি হলো লেখকসত্তা, দ্বিতীয়টি হলো সম্পাদক-সত্তা।হৃদয়ের ঝর্ণাধারায় যখন লেখার প্রবাহ শুরু হয়; সুন্দর কোন লেখার প্রাপ্তিলগ্ন যখন আসন্ন হয়; কলম থেকে কাগজের বুকে যখন কালি ঝরতে শুরু করে তখন আমার লেখক-সত্তা আমার সর্বসত্তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আমার চিন্তা ও চেতনার পরিম-লে সবকিছু তখন এমন আবছা হয়ে যায় যে, কোন কিছুকেই তখন আর স্পর্শ করতে পারি না এবং অনুভব করতে পারি না। লেখকের লেখার সঙ্গে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক তো হলো পাঠকের! সেই পাঠকের ছবিটাও আমার অন্তরের জগতে তখন অস্পষ্ট হয়ে যায়, বরং মুছেই যায়। আসলে তখন আমি চারপাশের কারো কথা ভাবি না, ভাবতে পারি না এবং ভাবতে চাইও না। কারণ আমি তখন লেখক ছাড়া আর কিছু থাকি না। আমার চিন্তায় তখন লেখার ভাব ও ভাবনা ছাড়া আর কিছু থাকে না। আমার অন্তর্জগতে  তখন আলোর শব্দ এবং শব্দের আলো ছাড়া আর কিছুর উদ্ভাস ঘটে না। কলম থেকে ঝরা প্রতিটি শব্দকে আমার তখন মনে হয় একটি করে ফুল, যার সুবাসে আমার সর্বসত্তা হয় সুবাসিত। ...***আমার দ্বিতীয় সত্তাটি হলো সম্পাদকের সত্তা! যখন আমি নিজের বা অন্যের লেখা সম্পাদনা করি তখন সম্পাদক সত্তাটি আমার জন্য হয়ে পড়ে প্রধান। বলতে পারি, সম্পাদক- সত্তার মাঝে আমি তখন আত্মসমাহিত হই। পার্থক্য এই যে, চিন্তা ও চেতনার জগতটি তখন পূর্ণ আচ্ছন্ন হয় না। তাই সবকিছু অনুভব করি এবং ইচ্ছে করলে স্পর্শ করতে পারি। একারণেই লেখার সময় যে পাঠকের কথা বিস্মৃত হই, সম্পাদনার সময় সেই পাঠকের কথাই অনেক বেশী মনে পড়ে। এককথায়, লেখকসত্তার বড় বৈশিষ্ট্য হলো আচ্ছন্নতা, আর সম্পাদকসত্তার বড় বৈশিষ্ট্য হলো জাগৃতি।যখন সম্পাদনা করি, অন্তরের গভীরে এ আকুতি তীব্রভাবে অনুভব করি, প্রিয় পাঠক, তুমি যেন আমার কাছটিতে এসে বসো। আমার সম্পাদনা শুরু থেকে শেষ তুমি যেন অবলোকন করো, পর্যবেক্ষণ করো এবং অনুধাবন করো।সম্পাদকের কিছু সময়ের সান্নিধ্য পাঠকসত্তাকে কতটা সমৃদ্ধ করতে পারে! এমনকি তার ভিতরের লেখকসত্তাকে কীভাবে জাগিয়ে তুলতে পারে এবং কতটা সজীব ও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে, হয়ত তুমি কল্পনাও করতে পারবে না।আমার বিশ্বাস, একজন পাঠক দীর্ঘ সময় পাঠ করে যতটা সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, সম্পাদকের সামান্য সময়ের সান্নিধ্যে তার চেয়ে অনেক বেশী সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।কিন্তু কথা হলো, আমার সম্পাদক- সত্তার এ আকুতি জীবনের বাস্তবতাকে তো আর অস্বীকার করতে পারে না! সম্পাদনার সময় প্রিয় পাঠক, যতই তোমাকে আমি কাছে পেতে চাই; যতই তোমার সামনে সম্পাদনার রূপরেখা ও মানচিত্র মেলে ধরতে চাই, জীবনের কঠিন বাস্তবতা মাঝখানে আড়াল হয়ে দাঁড়ায়, যা না আমি সরাতে পারি, না তুমি! তবে এই আকুতি ও ব্যাকুলতা থেকেই শুরু করেছিলাম সম্পাদকের রোযনামচা, যাতে দূর থেকে হলেও, তোমার অবসর সময়ে যতটুকু সম্ভব সম্পাদকের সান্নিধ্য গ্রহণ করতে পারো এবং সম্পাদনার প্রাচুর্য দ্বারা সমৃদ্ধ হতে পারো।প্রিয় পাঠক, তোমার প্রতি আমার আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস করি, আমার কথার ভুল অর্থ তুমি গ্রহণ করবে না। এখানে আমার উদ্দেশ্য আত্মস্তুতি নয়; যা কিছু বলেছি, নিজেকে তুলে ধরার ইচ্ছে থেকে নয়, তোমার প্রতি কল্যাণকামনার আকুতি থেকে বলেছি।***আসল কথা কী! একজন শিক্ষক হতে পারেন খুব সামান্য। তার মধ্যে থাকতে পারে বিভিন্ন দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা! কিন্তু তার শিক্ষকসত্তা অসামান্য! তিনি অতি ক্ষুদ্র হয়েও তার মর্যাদা তখন আকাশের উচ্চতাকেও স্পর্শ করতে পারে।একই ভাবে একজন লেখক হতে পারেন খুব সামান্য, কারণ তিনিও দোষে গুণে মানুষ। আশ্চর্য রকম সব দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে তারও মধ্যে। কিন্তু তার লেখকসত্তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। অন্যসময় বড় অসম্মানের মুখেও তিনি হতে পারেন ক্ষমাসুন্দর। কিন্তু তার লেখকসত্তা সামান্য অসৌজন্যেও অত্যন্ত আহত হয়।একজন সম্পাদক! শিক্ষক ও লেখকের মত তারও অবস্থান সামান্যতা এবং অসামান্যতার মাঝখানে। মানুষ হিসাবে হয়ত তিনি সামান্য ও ক্ষুদ্র, কিন্তু সম্পাদকসত্তায় তার আত্মমর্যাদা অত্যন্ত প্রখর। তো এতক্ষণ আমি যা বলেছি, যাবতীয় ক্ষুদ্রতা ও সীমাবদ্ধতার অনুভূতি সত্তেও আমার সম্পাদক- সত্তার অবস্থান থেকে বলেছি; তোমার প্রতি জাগ্রত কল্যাণ-কামনার আকুতি থেকে বলেছি। কথাগুলো যদি বলতে না পারতাম তাহলে না হতো আমার শান্তি, না হতো সস্তি। নিজেকে এখন বড় দায়মুক্ত মনে হচ্ছে। আর যে কোন ক্ষেত্রেই দায়মুক্তির অনুভূতি বড় স্বস্তিদায়ক ও শান্তিদায়ক।***প্রায় বিরক্তি উৎপাদনের পর্যায়ে চলে যায়, এমন দীর্ঘ ভূমিকার অবতারণা, প্রিয় পাঠক, কেন করেছি, এবার তা শোনো।আজ বৃহস্পতিবার, ৯ই মুহররম। সন্ধ্যায়, নতুন তারিখ যখন মাত্র শুরু হয়েছে। আমার পুত্র দীর্ঘ পনেরো দিনের বিদেশসফর থেকে ফিরে আসছে। পিতা হিসাবে স্বভাবতই আমি অত্যন্ত ব্যাকুলতার সঙ্গে তার প্রতীক্ষায় ছিলাম। আমার পিতৃসত্তা তখন স্বমহিমায় প্রোজ্জ্বল ছিলো। ‘পিতৃসত্তার মহিমা’, একজন পিতাই শুধু এর মর্ম ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেন। কত অস্থিরতা ও চঞ্চলতা ছিলো  সারাটা দিন! কত রকমের আয়োজন ছিলো সকাল থেকে সন্ধ্যা আমাদের দু’জনের! কিছু মধুর পরিকল্পনা ছিলো আমার সম্পূর্ণ একার, ‘পিতৃত্বের সবটুকু আকুতি ও মিনতি অর্পণ করে তাকে স্বাগত জানাবো। কত দূর যাবো তাকে এগিয়ে আনার জন্য? কীভাবে আলিঙ্গন করবো এবং তার বুকের স্পন্দন কীভাবে নিজের স্পন্দনের মাঝে ধারণ করবো?! ....হঠাৎ কী হলো! কিছুই বলতে পারি না, কখন আমার লেখকসত্তা জাগ্রত হলো, আর পিতৃসত্তা অনুভব থেকে মুছে গেলো। মনেই থাকলো না, আজ সারাটা দিন পুত্রের আগমন প্রতীক্ষায় কেমন ব্যাকুল ছিলাম! এদিকে সূর্য অস্ত গেলো, ওদিকে আমার লেখকসত্তা ভোরের রাঙা আলো নিয়ে যেন উদিত হলো! পূর্ণ আচ্ছন্নতার ও আত্মসমাহিতির মাঝে শুধু অনুভব করলাম একটি লেখার প্রাপ্তির শুভলগ্ন উপস্থিত। আকাশ থেকে ঝিরঝির শিশির যেন ঝরতে শুরু করেছে! আর সুন্দর একটি লেখা হৃদয়ের ঝর্ণা থেকে কলমের কালি হয়ে যেন নেমে আসছে!লেখাটি সমাপ্ত হলো, আর ধীরে ধীরে লেখকসত্তার আচ্ছান্নতা থেকে আমি জাগ্রত হলাম। তখন মনে পড়লো, আমার পুত্র না আসছে! এতক্ষণ ওর মা কিছু বলেননি, হয়ত বলতে সাহস হয়নি; এখন বললেন, ‘ছেলে উত্তরা থেকে রওয়ানা হয়েছে, বেশ কিছু সময় হলো!’প্রচ্ছন্ন তির্যকতাটা বুঝতে পেরে লজ্জা লজ্জা অনুভূতির মধ্যেই বললাম, তাই! এতক্ষণ বলোনি কেন! তাহলে তো উঠতে হয়! আরো আগেই তো ওঠা দরকার ছিলো!তিনি এখন মাতৃসত্তার মহিমায় উদ্ভাসিতা! তাই এমন কোন উপমা বলবো না, যা তাঁর মুখের মমতাসিক্ত হাসিটিকে মলিন করে।  সেই হাসিটি কী কারণে যেন আমাকে অর্পণ করে তিনি কক্ষান্তরে গেলেন। আমি ওঠবো ওঠবো করেও আর ওঠা হলো না!হঠাৎ কী হলো! এ সংখ্যার প্রথম কথা ও শেষ কথাটি -সম্পাদনা তো অনেক হয়েছে- এবার একটু আলতো করে পড়ার ইচ্ছে হলো। এবং ...আসলে এই ‘এবং’টুকুর জন্যই এত কথার অবতারণা! পড়তে পড়তে আমার পাঠকসত্তা এবং সেই সঙ্গে পিতৃসত্তা, বলতেও পারি না কখন আড়ালে চলে গেলো, আর জেগে উঠলো সম্পাদকসত্তা! এতবার সম্পাদনার পরো আবার শুরু হলো সম্পাদনা! অসত্য হবে না, যদি বলি, আমি নিজে করিনি, ঊর্ধ্বজগাতিক সত্তা আমাকে দিয়ে করিয়েছে। তো সম্পাদনা হলো; প্রথমে প্রথম কথা, তারপর শেষ কথা! সম্পাদনার নিমগ্নতার মধ্যেও সেই আকুতিটা আমার ভিতরে বারবার আলোড়িত হলো। কত ভালো হতো, কেউ যদি থাকতো এখন আমার কাছে! আমার পাশে! ‘ছেলেটা কামরায় বসে কী করছে? আমি ডাকবো কেন, সে নিজেও তো আসতে পারে!’শেষ কথাটি সম্পাদনা করে করে যখন লাল অংশটিতে উপনীত হলাম, ছেলে আমার কামরায় এলো। সালাম দিয়ে বসলো। আমি শুধু বললাম, বাবা এসেছো! বসো, এই দেখো কী সুন্দর সম্পাদনা আল্লাহ দান করছেন!ছেলে অবাক হলো, কী অন্যকিছু হলো, দেখার বা বোঝার মত অবস্থা তো আমার ছিলো না! তাই কিছু দেখলামও না, কিছু বুঝলামও না।শুধু হাত ধরে কাছে এনে, পাশে বসিয়ে বুঝিয়ে বুঝিয়ে ঐ অংশটুকু সম্পাদনা করলাম। ...ধীরে ধীরে যখন আচ্ছন্নতা থেকে জাগ্রত হলাম, মনে পড়লো, ছেলে তো আমার, কামরা থেকে আসেনি! বিদেশ থেকে এসেছে! আমি তো সারা দিন তার প্রতীক্ষায় ব্যাকুল ছিলাম! তাকে স্বাগত জানানোর এত আয়োজন, এত কল্পনা ও পরিকল্পনা তাহলে কোথায় গেলো!!***ছেলে যদি আমার ভিতরের এই  সত্তাটির সঙ্গে পরিচিত না হতো, কত ‘অশান্তি’ হতে পারতো! আল্লাহর শোকর, ঘরে আমার সন্তানেরা এবং তাদের মা আমার ভিতরের বিভিন্নমুখী সত্তার সঙ্গে পরিচিত এবং অন্তরঙ্গ। বিশেষ করে আমার পিতৃসত্তা, লেখকসত্তা ও সম্পাদকসত্তার সঙ্গে এবং আমার প্রেমিকসত্তার সঙ্গে। আল্লাহর শোকর, তাই ঘরে আমার শান্তিতে কখনো ব্যাঘাত ঘটেনি।ছেলেকে বললাম, দেখো বাবা, আমার সম্পাদকসত্তা, পিতৃসত্তাকে এতক্ষণ কেমন আড়াল করে রেখেছিলো! ... একজন ব্যক্তির ভিতরে বিভিন্নমুখী সত্তার একত্র-সমাবেশের যে দর্শন সেটাও তার সঙ্গে আলোচনা করলাম। এর মধ্যে সময়ের স্রােত থেমে ছিলো না। ঘড়িতে তখন বাজে রাত এগারোটা! ছেলে গেলো বিশ্রামে! ওর মা গেলেন আজকের কর্মক্লান্তি দূর করে আগামী ভোরের জন্য সজীবতা অর্জনের উদ্দেশ্যে। আমাকে একটা আলতো উপদেশ দিয়ে গেলেন, ‘আর কত, এবার শুয়ে পড়ো! স্বাস্থ্যের কথাটা মনে রাখতে হবে তো! আর কিছু না হোক, কাজেরই স্বার্থে!’তা তো রাখতেই হবে! কিন্তু রাতের নির্জনতা ও সময়ের নিঝুমতা হৃদয়কে এমনই সিক্ত ও বিগলিত করলো যে, প্রিয় পাঠক, তোমাকে বড় বেশী মনে পড়লো! ইচ্ছে হলো, তুমিও এসে বসো আমার পাশে। আজকের একটি লেখা ও দু’টি সম্পাদনা অবলম্বন করে কিছু সময় আমার সান্নিধ্যে যাপন করো।***প্রথমে দেখো উপরের লেখাটি। ৩৪তম পৃষ্ঠায় দেখো, একটি আধফোটা কলি! কলিটির দিকে তাকিয়ে আছি, কলমের কালিতে আঁকা যায় না, এমন এক তন্ময়তার সঙ্গে। নিজের অজান্তেই যেন আমার কল্পনায় ‘প্রস্ফুটিত’ হলো একটি শিশুর ছবি। ফুলের আধফোটা কলিটি, আর কলির মত ছোট্ট শিশুটি, দু’য়ে মিলে ভিতরে যে আকুতি সৃষ্টি হলো তা, তন্ময়তা ও আচ্ছন্নতার মধ্যেই আমাকে আশ্চর্য এক অপার্থিবতার জগতে নিয়ে গেলো। সেখানে আমি আর আমি থাকলাম না। সেখানে একটি আলোকছায়ার যেন আমি আলিঙ্গন লাভ করলাম! আর সুন্দর একটি লেখা আমার হৃদয়ের অঙ্গনে যেন পদ্মফুলের মত প্রস্ফুটিত হলো। সেই তন্ময়তা ও অপার্থিবতার মিলনমোহনায় কলম আমার হাতে উঠলো, আর লেখাটি হৃদয়ের উদ্যান থেকে কাগজের বাগানে আত্মপ্রকাশ করলো!***এবার প্রথম কথার উদ্ধৃত অংশটি দেখো। প্রথমে লাল অংশটি- ‘ছিলো না।’ এর সূত্র ধরে কলমের টানে চলে এসেছে ‘ছিলো মাত্র দু’জন।’ এতবার সম্পাদনা হলো, একবারও মনে হয়নি, ‘ছিলেন’ হবে। তারপর দেখো, দ্বিতীয় ‘আমাদের’ এখানে অতিরিক্ত মনে হয় কি না! কত সুন্দর হয় যদি বলি, ‘ছিলেন মাত্র দু’জন, আমাদের বাবা আদম এবং মা হাওয়া’!্‘ধীরে ধীরে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগলো।’ ‘সংখ্যাবৃদ্ধি’, এটা হলো গিয়ে তোমার পরিসংখ্যানের ভাষা, যা এখানে ভাবধর্মী লেখায় অসঙ্গত। এখানে লিখতে হবে ‘ধীরে ধীরে মানুষ বাড়তে লাগলো’।গায়ের রঙও অভিন্ন ছিলো। গাত্রবর্ণের বিষয়টি যেহেতু এখানে গুরুত্বপূর্ণ সেহেতু দু’টি পর্বে বিভক্ত করে যদি লিখি, ‘গায়ের রঙ, সেও অভিন্ন ছিলো’ তাহলে ভালো হয়।সংখ্যাবৃদ্ধির অনিবার্য ফল হলো বিস্তার। এখানে বৃদ্ধি শব্দটি অনিবার্য প্রয়োজনে রাখতে হচ্ছে। তবে সংখ্যা শব্দটি বাদ দিলে ‘পরিসংখ্যানছাপ’ কমে যায়।ছড়িয়ে পড়লো বিভিন্ন স্থানে, এখান থেকে যে কারো মনে হবে, ছড়িয়ে পড়াটা একবারেই বুঝি হয়েছে। অথচ তা নয়, বরং পর্যায়ক্রমে হয়েছে। তাই লিখলাম, ‘ছড়িয়ে পড়েছে এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে অন্যখানে; এভাবে বিভিন্ন খানে।এত হানাহানি, খুনাখুনি কীভাবে শুরু হলো এক পিতা-মাতার সন্তানদের মধ্যে? হঠাৎ মনে হলো, চূড়ান্ত স্তরের আগে মধ্যবর্তী আরেকটি স্তর ব্যবহার করা দরকার, যাতে বক্তব্যটি জোরালো ও আবেদনপূর্ণ হয়, তাই লিখলাম, ‘...এত খুনাখুনি কীভাবে শুরু হলো মানুষে মানুষে, এক পিতা-মাতার সন্তানদের মধ্যে? আবার ভাবলাম, ‘এক পিতা-মাতার সন্তানে’ হলে কেমন হয়?!এভাবে পুরো লেখার মধ্যে প্রচুর সম্পাদনা হলো। নিজের কাছেই নিজে তখন লজ্জিত হলাম যে, এতবারের সম্পাদনায়ও কেন এগুলো নযরে এলো না!***শেষকথা, এটি অন্তত ছয় সাতবার সম্পাদনা করেছি। মাঝখানে বিরতি দিয়ে দিয়ে। এটাই নিয়ম; দুই সম্পাদনার মাঝে পর্যপ্ত সময়ের বিরতি থাকলে সম্পাদনায় মৌলিকত্ব আসে। প্রতিবারই নতুন নতুন সৌন্দর্যের সংযোজন ঘটে। ভাবে, ভাষায়, অলঙ্কারে ক্রমোৎকর্ষ সাধিত হয়। তো যখন মনে হলো, যথেষ্ট হয়েছে এবং যথেষ্ট সুন্দর হয়েছে তখন শেষবারের মত আলতো করে দৃষ্টি বুলালাম, যেন বানানবিভ্রাট থেকে না যায়। তখন .. তখন দেখি, ইয়া আল্লাহ, এমন ত্রুটি! এমন অসৌন্দর্য!! এতবারের দেখায় একবারও নযরে এলো না! এলো কখন!? নযর যখন প্রায় সরিয়ে নিলাম! আপনিও দেখুন (শেষকথার মধ্যে প্রথমকথার প্রসঙ্গ এসেছে)- ‘যখন প্রথম কথা লিখি তখন মনের মধ্যে একটা আশাবাদ কাজ করে। ....‘কাজ করে’, কথাটায় স্থূলতার ছাপ রয়েছে বলেই মনে হলো; এটা চিন্তা করে লিখলাম, ‘তখন কোমল একটি আশাবাদ হৃদয়কে যেন আলতো করে ছুঁয়ে যায়!’দু’য়ের মধ্যে তুলনা করে দেখুন; আশা করি আপনিও বুঝতে পারবেন পার্থক্য। এরপর দেখুন-তখন অন্ধকারের মধ্যেও আলোর একটা রেখা আমাকে যেন অনুপ্রাণিত করে। ভিতরের এ উদ্দীপনা, সামান্য হলেও একটা শক্তি যোগায় যে এখনো ভালো কিছু কাজ হতে পারে।এখানে প্রথম কথা হলো, অনাবশ্যক দীর্ঘতা পুরো বক্তব্যের কাঠামোকে শিথিল ও পানসে করে ফেলেছে। কথাটা এভাবে সুসংক্ষিপ্ত হতে পারে- ‘তখন অন্ধকারের মধ্যেও আলোর একটা ক্ষীণ রেখা আমাকে যেন অনুপ্রাণিত করে যে, এখনো ভালো কিছু কাজ হতে পারে।’রোগ যত গুরুতর হোক, এখনো হতে পারে উপশম ...। কারণ এখনো আকাশ থেকে শিশির ঝরে ...দেখুন আগে ও পরে হৃদয়কে স্পর্শ করার মত কী কোমল-¯িœগ্ধ ভাব ও ভাষা! এর মধ্যে হলো গুরুতর রোগ -ব্যাধি’র অবতারণা! আগের ও পরের সঙ্গে স্থূল হয়ে যায় না?! এখানে তো প্রতিটি প্রসঙ্গ হতে হবে কোমলতা ও ¯িœগ্ধতার সঙ্গে পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ! এমন ত্রুটিপূর্ণ লেখা কোন গৌরব বয়ে আনতে পারে লেখকের জন্য! প্রথমে ‘কাজ’ শব্দটি বাদ দিয়ে লিখলাম, এখনো ভালো কিছু হতে পারে। তারপর ভাবলাম, রোগব্যাধির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ‘পথ ও পথের যাত্রা’ প্রসঙ্গ আনা যায়। ‘রোগ যত গুরুতর হোক’ এর স্থলে লিখলাম, ‘পথ যত দুর্গম হোক’।‘এখনো হতে পারে উপশম’ এর স্থলে লিখলাম, ‘এখনো হতে পারে কল্যাণের অভিমুখে জীবনের যাত্রা’। মনে হলো, আগের তুলনায় যথেষ্ট ভালো হয়েছে। কিন্তু মনের ভিতরে পূর্ণ সন্তুষ্টি হলো না। সামান্য হলেও এখনো যেন স্থূলতা রয়ে গিয়েছে! কল্যাণ শব্দটিকে অবলম্বন করে উপযুক্ত কিছু কোমল ও ¯িœগ্ধ শব্দ তালাশ করলাম, মনে পড়লো শুভ ও শুভ্র শব্দদু’টি। যুগলব্যবহার বেশ সুন্দর ও শ্রুতিমধুর হতে পারে। এখন ‘পথ যত দুর্গম হোক’-এর স্থলে লিখলাম, ‘সময় যত নির্মম হোক’। ‘এখনো হতে পারে কল্যাণের অভিমুখে জীবনের যাত্রা’-এর স্থলে লিখলাম, ‘শুভ ও শুভ্র এখনো হতে পারে জীবনের শোভা।জীবনের ... এ পর্যন্ত এসে অনেকটা সময় থেমে ছিলাম, উপযুক্ত শব্দটি কী হতে পারে? কত কিছু যে ভাবনায় এলো, আর গেলো! সময়ও গড়িয়ে গেলো সময়ের গতিতে! কিন্তু সুন্দরতমের জন্য সময় তোমাকে দিতেই হবে উদারভাবে! প্রথমে চিন্তা করলাম এভাবে, ‘এখনো হতে পারে শুভ ও শুভ্রের অভিমুখে জীবনের যাত্রা। কিন্তু ‘অভিমুখ’-এর মত কঠিন শব্দ তো থেকেই যাচ্ছে! তো বাক্যকাঠামোতে পরিবর্তন এনে কী লাভ হলো! তাই আগের কাঠামোতে ফিরে এসে চিন্তা করলাম, দু’টি শব্দ পেলাম, ‘শুভ ও শুভ্র এখনো হতে পারে জীবনের আলো/সঙ্গী’। আলো শব্দটি তো খুব ভালো, কিন্তু শুভ ও শুভ্রকে জীবনের আলো বলাটা খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে হয় না! পক্ষান্তরে ‘সঙ্গী’শব্দটাতে রয়েছে, হালকা হলেও, স্থূলতার ছাপ। হঠাৎ মনে হলো, আগের দু’টি শব্দের মত তালব্য-শ দিয়ে কিছু পাওয়া যায় কি না, দেখি তো! চিন্তার মধ্যে হঠাৎ করেই ঝিলিক দিয়ে উঠলো ‘শোভা’ শব্দটি! আনন্দিত হলাম এবং আকাশের প্রতি কৃতজ্ঞতা নিবেদন করলাম। এবার লিখলাম, ‘সময় যত নির্মম হোক, শুভ ও শুভ্র এখনো হতে পারে জীবনের শোভা। তারপর মনে হলো ‘ভালো কিছু’-এর মত এখানেও  ন্যূনতা প্রকাশ করার জন্য ‘কিছু’ শব্দটি যোগ করি।***প্রিয় পাঠক, এই হলো আমার আজকের রাতের লেখা ও সম্পাদনার হালকা একটি চিত্র যা তোমাকে এঁকে দেখালাম।আশা করি বুঝতে পেরেছো, পুষ্পের সম্পাদনার সময় যদি কাছে এসে বসতে পারো এবং কিছু সান্নিধ্য গ্রহণ করতে পারো তাহলে সাহিত্য সাধনার পথে কত মূল্যবান পাথেয় অর্জিত হতে পারে। আমার প্রিয় বহু তালিবে ইলমকে কাছে বসিয়ে বসিয়ে এভাবে সম্পাদনার দেখিয়েছি। কোন শব্দ কেন বাদ গেলো, কোন শব্দ কেন সংযোজিত হলো। বাক্যবিন্যাসে কী সমস্যা এবং কীভাবে তা দূর করা যায়। ....তাদের মধ্যে লেখার যোগ্যতা ছিলো। যদি আমার এত দিনের শুধু সম্পাদনা -গুলো ওরা পরবর্তীদের জন্য কাগজের বুকে ধরে রাখতো তাহলে সাহিত্যের অঙ্গনে কী বিপুল সম্পদ গড়ে উঠতো! তারা নিজেরাও কত বড় গৌরবের অধিকারী হতো! বর্তমান প্রজন্ম তাদের প্রতি কত কৃতজ্ঞ হতো!!কিন্তু কথা হলো, আল্লাহর ইচ্ছা না হলে তো কিছুই হয় না।পুষ্পের প্রতিটি সংখ্যায় যে পরিমাণ সম্পাদনা হয় সেগুলোর বিশদ পর্যালোচনা যদি অন্তত বাণীবদ্ধ করা সম্ভব হতো তাহলেও তার পরিমাণ হতো বিপুল, যাকে নাম দেয়া যায়, ‘সম্পাদনাসাহিত্য’!কিন্তু সমস্যা কী জানো! সবাই স্বপ্নের কথা বলে, ‘আমি হতে চাই, আপনার স্বপ্নের সেই দশতরুণের একজন!’ কিন্তু যদি বলি, আমার কাছে এসো বসো, একজন সাধকের ধৈর্য নিয়ে, তখন হাই তোলে আর বলে, একটু কাজ আছে। ... লেখাটি সম্পাদনা ছাড়াই ছাপা হলো। যদি কখনো ....!পুনশ্চ ঃ একটু আগে বলেছি, ‘নিজের লেখা বা অন্যের লেখা যখন সম্পাদনা করি।’আসল সত্য এই যে, সেই লেখা তখন অন্যের লেখা থাকে না। কারণ  লেখাটির প্রতি এমন মমতা অনুভব করি যে, মনে হয় আমারই লেখা। তাই ...!!