যিলক্বাদ মাসের শেষ দিকে, ঈদুল আযহার অল্প ক’কদিন আগে মাদরাসাতুল মাদীনাহর খিদমাতি কাফেলা গিয়েছিল টেকনাফের মোহাজিরীন-শিবিরে। আলহামদুল্লিাহ, এক বছরের মধ্যে এটা ছিল মাদরাসাতুল মাদীনাহর পক্ষ হতে প্রেরিত দশম কাফেলা।গত বছর এ সময়েই প্রতিবেশী আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমানের উপর যখন কেয়ামত নেমে এসেছিল; ‘অহিংস’ বৌদ্ধদের অর্ধশতাব্দীর অব্যাহত সহিংসতা যখন সবসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল; বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত আরকানি মোহাজিরীনের ‘ঢেউ’ যখন নাফ নদির তীরে এসে একের পর এক আছড়ে পড়ছিল তখন অন্যদের সঙ্গেমাদরাসা -তুল মাদীনাহর খিদমাতি কাফেলাও মুহাজিরীনের ইস্তিক্ববালে ‘যা আছে তা’ই নিয়ে হাজির হয়েছিল। আমাদের তখন বাহ্যিক কোন উপায়-উপকরণ ছিল না; একমাত্র সম্বল ছিল আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল এবং আসমানের গায়বি মদদের ইয়াকীন ও বিশ্বাস। আল্লাহ গায়ব থেকে আমাদের মদদ করেছিলেন। অল্প কয়েকদিনের জন্য ‘প্রস্তুতি’ নিয়ে আসা আমাদের কাফেলা আল্লাহর ইচ্ছায় আঠারো দিন মুহাজিরীনের খিদমতে নিয়োজিত ছিল। কল্পনায়ও ছিল না, এমন ক্ষুদ্র ও দুর্বল কাফেলা এরূপ খিদমত আঞ্জাম দিতে পারে। আসল কথা হল, মানুষ তো কিছু করে না, পর্দার আড়াল থেকে আল্লাহর কুদরত সবকিছু করে দেয়!আমাদের জানা ছিল না, আবার কি তাওফিক হবে খিদমাতি কাফেলা নিয়ে মুহাজিরীনের শিবিরে আসার? আমাদের খাস্তা হালতের দিকে তাকালে তো...। কিন্তু মুহাজিরীনের জন্য আব্বুর, আমাদের আদীব হুযূরের দরদ-ব্যথা ও ব্যাকুলতার লাজ আল্লাহ রক্ষা করেছেন। কিছু দিন পরই আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে দ্বিতীয় খিদমাতি কাফেলা রওয়ানা হয়েছে। তারপর এক বছরে একে একে নয়টি কাফেলা। প্রতিটি কাফেলা ফিরে আসার পর আব্বু আসমানের দিকে তাকিয়ে বে-কারারি জাহির করেন, আয় আল্লাহ, আমরা দুর্বল, নিঃসম্বল, কিন্তু তোমার খাযানা তো অফুরন্ত! আবার এবং বারবার আমাদের তুমি তাওফিক দান কর। আল্লাহর অনুগ্রহে কিভাবে কিভাবে যেন পরবর্তী কাফেলার ইন্তেযাম হয়ে যায়! আমরা যারা কাফেলায় আসি যাই, আমরা তো তিন চারদিনে ‘ক্লান্ত শ্রান্ত’ হয়ে ফিরে আসি। কিন্তু যার বুকে পরবর্তী কাফেলার বে-কারারি তাঁর তো ‘ক্লান্ত’ হওয়ার সুযোগ নেই! তাঁর তো চলতে থাকে ‘অক্লান্ত পরিশ্রম’। ফোঁটা ফোঁটা করে আবার কিছু ‘পানি’ জমা হয়। সেই কয়েক কাতরা পানি নিয়ে আবার খিদমাতি কাফেলা রওয়ানা হয়। মুহাজিরীনের প্রয়োজনের সাগরে হয়ত তা কয়েক ফোঁটা, তবু কিছু পিপাসার্ত প্রাণের কিছু কষ্ট কিছু সময়ের জন্য নিবারিত হয়!এভাবে আর কত দিন?! বাস্তবতা তো এই যে, দিন দিন ‘সীমাবদ্ধতা’ যেন বেড়েই চলেছে। প্রতিবারই পরবর্তী কাফেলার প্রস্তুতি কঠিন হয়ে পড়ছে। আব্বু তো তাঁর সাধ্যের সর্বশেষটুকু নিংড়ে দিচ্ছেন, কিন্তু চারপাশে যেন সীমাহীন ‘ক্লান্তি আর নির্জীবতা!’কেউ বলেন, ‘এই সেদিন তো শরিক হইলাম!’ কেউ বলেন, ‘আমি তো দুইবার শরীক হইছি!’কিন্তু ওখানে ক্ষুধা অনাহার যে প্রতিদিনের! আসলে প্রয়োজন যতটা না তাদের, তার চেয়ে অনেক বেশী যে আমাদের, এ মহাসত্যটি যদি সবার উপলব্ধিতে এসে যায় তাহলে কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়, কিন্তু হায়...!***সিদ্ধান্ত হল, ২৬ শে জিলক্বাদ রোজ বুধবার দিবাগত রাত নয়টায় মাদানী মানযিল থেকে কাফেলা রওয়ানা হবে। এশার জামাত হল। আব্বু ইমাম হলেন, যদিও দোতালায় উঠে আসতে বেশ কষ্ট হল। ইকামতের পর তিনি চালকের খোঁজ নিলেন, বাসস্টেশন পর্যন্ত যিনি আমাদের পৌঁছে দেবেন। তখন আমাদের হুঁশ হল যে, তাকে ছাড়াই তো আমরা জামাতে দাঁড়িয়ে গিয়েছি! আল্লাহ মাফ করুন! খুবই লজ্জিত হলাম। আমাদের তারবিয়াতের জন্য আব্বু কিছু ‘তিরস্কার’ করলেন। তারপর এই মুনাজাতসহ কাফেলাকে বিদায় জানালেন, ‘আল্লাহ যেন নযরে বদ থেকে হেফাযত করেন; ফিতনা ও ইমতিহান থেকে নিরাপদ রাখেন; তাওফীকে ইলাহী যেন হামেশা শামিলে হাল থাকে।’ তিনি বারবার বলে দিলেন ফা আগশাইনা হুম ফাহুম লা য়ুবছিরূন-এর আমল জারি রাখার কথা। চারজনের কাফেলা; আমার চাচা গাজী ছাহেব, আমাদের ‘মাওলানা তালিবে ইলম’ যায়েদ; মাওলানা ফায়রোয এবং আমি। আমার চাচা কাতেব ছাহেবের কাফেলায় শরীক হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অনিবার্য কারণে সম্ভব হলো না। আব্বু বললেন, ঠিক আছে, আগামীবারের জন্য তৈরী থেক। কাফেলার আমীর হলেন মাওলানা ফায়রোজ। শুরু থেকে প্রায় প্রতিটি কাফেলারই তিনি হাযিরান। মুহাজিরীনশিবিরে মাদরাসাতুল মাদীনাহর খিদমতি কাফেলার কার্যক্রম পরিচালনায় তার মেহনত অনেক এবং নিরবচ্ছিন্ন। আল্লাহ আরো তাওফীক দান করুন এবং উত্তম বিনিময় দান করুন, আমীন।***কক্সবাজার শহর থেকে একপাশে পাহাড়, একপাশে সাগর, মাঝখানে দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। টানা পনের ঘণ্টা সফরশেষে সেই সড়ক হয়ে আমরা টেকনাফে প্রবেশ করলাম। সমুদ্রে তখন জোয়ারের উচ্ছ্বাস। মাছধরা নৌকাগুলো নোঙ্গর করে আছে তীরের কাছে। নৌকাগুলোর দিকে তাকিয়ে মন বিষন্ন করা সেই স্মৃতিগুলো যেন আবার ফিরে এল! এই তো সেদিন এ মাছশিকারিরাই যেন মেতে উঠেছিল ‘রোহিঙ্গাশিকারে’। মাছশিকারের এ নৌকাগুলোই ব্যবহৃত হয়েছিল, সব হারিয়ে শুধু জানহাতে নাফ নদির ঐপারে এসে দাঁড়ানো রোহিঙ্গাদের...। কত মর্মান্তিক সব ঘটনা তখন কানে এসেছে! তারপরও এপারে পা রেখে অশ্রুভেজা একটি হাসি ফুটত রোহিঙ্গা মা-বোনদের ভীতবিহ্বল মুখে! জানটা তো অন্তত রক্ষা পেল! হয়ত আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি সেই সব মর্মবিদারক ঘটনা! নিজেদের অপরাধের কথা ভুলে গিয়েছে হয়ত অপরাধীরাও। এমনকি রোহিঙ্গা মাবোনেরাও হয়ত আর তা মনে করার সুযোগ পায় না। তাদের তো এখন একমাত্র চিন্তা, কোন না কোনভাবে জীবন ধারণ; নিজের, সন্তানের। প্রতিটি দিনের আলোতে তাদের ভাবতে হয় সামনের রাতটার অন্ধকারের কথা! কিন্তু দুই কাঁধে যিনি হিসাবের খাতা খুলে রেখেছেন ‘তিনি তো খ্যয়র ও শ্যার কিছুই ভোলেন না, হোক তা পরিমাণে ‘সর্ষেদানা’! জাতির পাপ হয়ত ব্যক্তি মোচন করতে পারে না, তবে কুদরতের পাকড়াও থেকে নিজেকে তো রক্ষার চেষ্টা করা যায়, আমাদের মাটিতে আশ্রয় নেয়া অসহায় মানুষগুলোর কিঞ্চিৎ কষ্টলাঘবের মাধ্যমে। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমীন।***টেকনাফ শহরে পথে পথে মুহাজিরীনের সেই ‘দিকভ্রান্ত’ ভিড় এখন নেই। সবাইকে ‘জড়ো’ করা হয়েছে পাহাড়ে পাহাড়ে আশ্রয়শিবিরে। হাঁ, আশ্রয়শিবির! তবে নিজের চোখে যারা দেখেনি তারা বুঝতে পারবে না, কাকে বলে আশ্রয়, কাকে বলে শিবির; এমনকি যারা দাদাবাবুদের শরণার্থী শিবিরে ‘জাউ’ খেয়েছে, তারাও না।টেকনাফে পৌঁছে ‘অতিথিকায়’ (হোটেলে) স্থিত হতে হতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। ইনশাআল্লাহ আগামীকাল আমরা যাব বালুখালির মুহাজিরশিবিরে আমাদের নির্ধারিত খেদমতস্থলে!বিকেলে মাওলানা ফায়রোয আর আমি বের হলাম শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশ্যে। পুষ্পের আরাকানসংখ্যায় প্রকাশিত আমাদের প্রথম সফরনামায় আছে শাহপরীর দ্বীপের কথা। দেশের সর্বদক্ষিণের এই ‘দ্বীপ-বিন্দু’টি থেকেই শুরু হয়েছিল আমাদের প্রথম খিদমাতি কাফেলার কার্যক্রম। সে সময় যে কয়টি পথে মুহাজিরীন প্রবেশ করেতেন তার মধ্যে এটা ছিল অন্যতম। শাহপরীর দ্বীপকে টেকনাফের মূল অংশ থেকে বিচ্ছিন্নকারী ভাঙ্গা নামের সেই জলাভূমিটি এখনো ‘ভাঙ্গাই’ আছে। সাগরের জোয়ারে বাঁধ ভেঙ্গেছে বহুদিন হল, এখন সবাই তাকিয়ে আছে, সাগরের জোয়ার রোধ করার জন্য ‘উন্নয়নের জোয়ার’ কবে এ পর্যন্ত পৌঁছবে। শোনা যায়, কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আশি কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন-ড্রাইভ সড়কটিকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সে লক্ষ্যে বাঁধ নির্মাণ করে ‘ভাঙ্গাকে জোড়া’ দেয়ার কাজও শুরু হয়েছে। তেমন কোন কর্মতৎপরতা অবশ্য আমাদের চোখে পড়ল না, তবে ‘চিন্তা-তৎপরতা’ যদি শুরু হয়ে থাকে তাও বা কম কিসে! শাহপরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফে আসার পথে এখানে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হত মুহাজিরীনকে। মনে পড়ে, মাটি ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে বাঁশের ছোট্ট একটি সাঁকো দেয়া হয়েছিল এখানে নৌকা পর্যন্ত পৌঁছার জন্য। আগের সফরনামায় আছে তার বিবরণ। সাঁকোতে ওঠার সময় জনপ্রতি দশ টাকা শুধু যে আদায় করা হত তা নয়, রীতিমত উশুল করা হত। কোথায় এখন সাঁকো, আর সাঁকোর সেই ‘জমিদার’! এমনই হয়, কেও থাকে না, সময় ও ঘটনা অতীত হয়ে যায়। কিছু দীর্ঘশ্বাস শুধু বাতাসে ভেসে বেড়ায়। আজ আমরা ভাঙ্গা পার হলাম বিশ টাকার নৌকাভাড়ায়, তখন নৌকার চালক উশুল করত যার কাছ থেকে যত পারা যায়। ভাঙ্গায় এখন ভাসমান অল্প ক’টি নৌকা। বাকিগুলো উল্টো হয়ে পড়ে আছে পাড়ে। ওগুলোর ‘কঙ্কালসার দেহ’ই বলে দেয়, ‘খাদ্য’ নেই বহুদিন! মুহাজিরীনের অশ্রুভেজা পয়সা হাতিয়ে কতই বা ‘মুনাফা’ হয়েছিল? মুনাফালিপ্সা ত্যাগ করে, যদি একটু মানবিকতার পরিচয় দেয়া হত তাহলে এমন কী...!আব্বুর উপদেশ মনে পড়লো, অন্যের সমালোচনায় কী লাভ, আত্মসমালোচনা কর! নিজেদের পরিম-লে আমি, আমরা এর চেয়ে কতটা উত্তম? রিকশাচালকের ঘামের মূল্য নিয়ে কী করি আমরা? কিংবা পথের পাশে বসে থাকা ক্রেতাহীন ‘সব্জিবিক্রেতা’র অসহায়ত্বের সুযোগে...! এরকম অমানবিকতা থেকে আমরা বিরত থাকতে পারি না! কারো সহায় যদি হতে নাও পারি, অসহায়ত্বকে যেন সুযোগ-রূপে ব্যবহার না করি। আব্বু সারাটা জীবন চেষ্টা করে যাচ্ছেন আমাদের অন্তরের মাটিতে, তালেবানে ইলমের কলবের যমিনে এই সব শুভ্র চিন্তা ‘রোপণ’ করতে এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনার ‘বড়ত্ব’ সবার সামনে তুলে ধরতে, আর তা শুধু কথা দিয়ে নয়, আচরণ দিয়ে। আব্বুর যে মহত্তম জীবনদর্শন, খুব সামান্যই তো নিজেদের জীবনে আমরা আনতে পেরেছি, তারপরো মাদরাসাতুল মাদীনায় কাজ করে যাওয়া প্রতিটি শ্রমিক আবার আসতে চায় এখানে! মোড়ের রিকশাচালক যখন বলে ‘এই হুজুররা কত ভালা, সালাম দিয়া কথা কয়, ভাড়া বেশি দেয়’, তখন মনে হয়, এত সামান্যের এত অসামান্য প্রাপ্তি! আরো যদি আগে বাড়া যেত! আমার আব্বুকে, আমাদের আদীব হুযূরকে যদি পূর্ণ অনুসরণ করা সম্ভব হত!! এই সফরের কয়েকদিন আগে, আমাদের মাদরাসার প্রতিবেশী কৃষক মূল্য পড়ে যাওয়ায় ক্ষেতের পুঁইশাক নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন। মাওলানা ফায়রোয বাজারমূল্যের চেয়ে বেশী অর্থ দিয়ে মাতবাখের জন্য তার পুঁইশাক খরিদ করেছিলেন। শুনেছি, ‘বাকহারা’ কৃষকটি ঘামে ভেজা গামছাটি দিয়ে অশ্রুভেজা চোখ মুছেছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, এমন বহু ঘটনায় সমৃদ্ধ মাদরাসাতুল মাদীনাহর জীবন। আদীব হুযূর সবসময় বলেন, তাঁর মত করেই বলেন, ‘আমার কাছে ‘আমল’ হয়ত তোমরা কিছু পাবে না, তবে কিছু চিন্তা, চেতনা ও জীবনাচার আল্লাহ দয়া করে দান করেছেন। এগুলো আমার কাছ থেকে গ্রহণ করে জীবনকে তোমরা সমৃদ্ধ করতে পারো’। কিন্তু হায়!।***ভাঙ্গা পাড়ি দেয়ার সময় নৌকায় আরো কয়েকজন যাত্রী ছিলেন এবং ছিল কয়েকটি শিশু; আর আমাদের সঙ্গে ছিল তাদের জন্য চকোলেট। আব্বুর, আদীব হুযূরের বহু তারগীব ও তানবীহের পর এখন মনে হয় আমরা কিছুটা বুঝতে পারছি যে, একটি চকোলেট শিশুহৃদয়কে কত আনন্দ দেয় এবং আমাদের জন্য তা দয়াময়ের কত বড় ‘দান’ বয়ে আনে। চকোলেট বিতরণের পর হঠাৎ দেখি এক ‘বয়স্ক শিশু’ বসে আছেন একটি ছোট্ট শিশুর পাশে; আরো দেখি, তার দৃষ্টি ছোট্ট শিশুটির হাতের চকোলেটের দিকে। দৃশ্যটি দেখে আমি মাওলানা ফায়রোযের দিকে তাকালাম, আলহামদুলিল্লাহ, তারও নযরে এসেছে। বুঝলাম, শৈশবের স্মৃতি মনে পড়েছে! কী করি, সরাসরি যদি তার হাতে দেই, সঙ্কোচ হতে পারে তো! অনেক ভেবে পাশের শিশুটির হাতে দিলাম। বুড়ো শিশুটির দন্তুহীন মুখের বিগলিত হাসিটি এখনো চোখে ভাসে। জীবনে এ অভিজ্ঞতা এই প্রথম। আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করলাম।শাহপরীর দ্বীপে নৌকা থেকে নামার সময় একটি দৃশ্য! বলা দরকার, এ যুগের দুর্লভ দৃশ্য!! আসলে ভাবলে অনেক কিছু, না ভাবলে কিছুই না। দেখি, একটি ছেলে মাওলানা ফায়রোযকে কী যেন বলছে! তার সলজ্জ হাসি ও বিন¤্র দৃষ্টি; খুব অবাক হলাম! মাওলানা ফায়রোয বললেন, মাঝির ছেলে, ভাড়া নিতে এসেছে। ইয়া সুবহান! দান নয়, প্রাপ্য ভাড়া! তবু নিতে তো হবে হাত পেতে, তাই এমন সংকোচ! বয়স বারো অতিক্রম করেছে, মনে হয় না। রাজধানী শহরের ‘শিক্ষিত’ যুবক দূর সাগর পারের ‘শিক্ষাবঞ্চিত’ বালকটির কাছ থেকে কত বড় শিক্ষা পেল আজ! কামনা করি জীবনের সব ‘অনর্থ’ থেকে আল্লাহ তাকে নিরাপদ রাখুন। নৌকা থেকে নামার সময় ছেলেটির হাতে কিছু হাদিয়া দিলাম অন্তরঙ্গ কয়েকটি কথা বলে। প্রতিদানে কী পেলাম? যা আমার বাবা তাঁর ‘ছাত্র’দের কাছ থেকে কম পান, কৃতার্থতায় বিগলিত একটি হাসি! মুহাজিরীনের সঙ্গে মাঝি ও চালকদের আচরণ-দৃশ্যের কথা মনে পড়ে মনটা যে বিষন্ন হয়েছিল, আল্লাহ যেন এই কিশোরের মাধ্যমে একটু সান্ত¡নার ব্যবস্থা করলেন। আব্বুকে দেখি, বিভিন্ন ঘটনায় এরকম ভাবনার সাহায্যে সান্ত¡না ‘খুঁজে’ নিতে। কখনো তাঁর কোন ছাত্রের মুখের অভিব্যক্তি দেখে তিনি বলেন, আচ্ছা! আমি যা ভাবছি, বাস্তব যদি তা নাও হয়, ভাবনার সান্ত¡নাটুকু তো সত্য! আর সব সত্যের বড় সত্য তো, ‘আমার প্রতি আমার বান্দার যেমন ভাবনা, তার প্রতি আমার তেমনি আচরণ।’***শাহপরীর দ্বীপে এবার আমাদের আলাদা কোন কাজ নেই। এসেছি শুধু ঐ জায়গাটি নিজের চোখে আবার দেখতে, যেখানে দাঁড়িয়ে, নৌকা থেকে নেমে আসা মুহাজিরীনকে সালাম দিয়ে আমরা গ্রহণ করতাম, আর তাদের মনে হতো, ‘কোন ভয় নেই, এখন আমরা নিরাপদ’; আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, এখান থেকে ওখানকার আকাশ দেখা, একসময় যা দেখেছিলাম লাল আগুনের কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। স্থানীয়রা জানালো, এখনো মাঝে মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়। শাহপরীর দ্বীপে ‘বড় মাদরাসায়’ মাওলানা ফায়রোযের উস্তায মাওলানা ইউনুস সাহেবের সঙ্গে দেখা হল। ঐ কঠিন সময়ে আমাদের খিদমতি কাফেলার কাজে তিনি অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁকে আব্বুর সালাম পৌঁছালাম এবং পিছনের কথা স্মরণ করে আবারো তাঁর শোকর আদায় করলাম। ঐ সময় বহু কাফেলা খেদমতের নিয়তে এখানে এসেছিল এবং মেহমানরূপে মাদরাসায় অবস্থান করেছিল; মাদরাসার আসাতিযা ও তালিবান তাদের মধ্যে আমাদের কথা আলাদা করে মনে রেখেছেন দেখে ভাল লাগল। আমরা তখন বিশেষভাবে একটা কাজ করেছিলাম, নিজেরা এবং স্থানীয় লোক নিয়োগ করে, মুহাজিরীনের আগমন-নির্গমনের মধ্যবর্তী সময়ে পুরো মাদরাসা পরিচ্ছন্ন করা। বোঝাই যেত না, একটু আগেও এখানে হাজার দেড় হাজার বিধ্বস্ত বনী আদম পড়ে ছিলো! সাগর পারে মুহাজিরীনের অবতরণস্থলে এসে দাঁড়ালাম। একটার পর একটা দৃশ্য স্মৃতিতে জেগে ওঠে! দিলের যখম তাতে তাজা হয়, চোখের পাতা ভিজে ওঠে। সব কিছু এখন ‘শান্ত’, তবু যেন ঢেউয়ের গর্জন ছাপিয়ে শোনা যায় মুহাজিরীনের বুকফাটা আর্তনাদ। দূর থেকে চোখে পড়ল, দ্বীপের টার্মিনালে নোঙ্গর করা ওপারের পণ্যবাহী ট্রলার। কোরবানীর ‘পশু’ নাকি আমদানী করা হচ্ছে ওদের কাছে থেকে। হায়, একটুও কি বাধা দিল না বিবেক! আবার ভাবলাম, এখন তো ‘সমঝোতা’র পরিবেশ! যখন আগুন জ্বলেছে, রক্ত ঝরেছে, তখনই আমাদের ‘মান্যবর’ ভাতের জন্য চাল আনতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ব্যবসার জায়গায় ব্যবসা’! আসলে এখানেও প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। আমরা ‘লাল হাত থেকে সাদা কাগজ’ নেয়ার জন্য হাত পেতেছি, তাতেও কি আছে গায়রতের কোন পরিচয়! আমাদেরও তো কর্তব্য দ্বীনকে বদদ্বীনের কাছে করুণার পাত্র না বানান। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন, আমীন।***সন্ধ্যায় টেকনাফ ফিরে ‘বড় মাদরাসা’য় মাওলানা আনিস সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম, তিনি খুশি হলেন। ঐ সময়ের সহযোগিতার কথা স¥রণ করে তাকেও কৃতজ্ঞতা জানালাম। এটা আমার আব্বুর, আমাদের আদীব হুযূরের শিক্ষা;‘জীবনে যখন যার কাছ থেকে সামান্য কিছু পেয়েছ, কৃতজ্ঞ চিত্তে তাকে মনে রেখ।’যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তাঁকে এমনই দেখেছি। কারো কাছ থেকে, এমনকি হয়ত তাঁর কোন ছাত্রের কাছ থেকে পেয়েছেন সামান্য সদাচার, বা সৌজন্যপূর্ণ আচরণ। কিন্তু এতবার এতভাবে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, মানুষটি নিজেও ভাবতে শুরু করে...। পক্ষান্তরে অন্যের প্রতি তাঁর বড় বড় ইহসান ও সাদাচার! তিনিও ভুলে যান, সেও মনে রাখে না! মাদরাসা থেকে ফেরার পথে হঠাৎ শুনি, দূর থেকে একজনের সালাম! ঔষধের দোকানদার। তার কাছ থেকে মুহাজিরীনের জন্য ঔষধ সংগ্রহ করেছিলেন মাওলানা ফায়রোয। ক্রেতাকে বিক্রেতা মনে রেখেছেন! কারণ আর কিছু না, একটু হাসি, একটু বিন¤্র আচরণ। ছোটাছুটি ও ব্যতিব্যস্ততার এ জীবনে এতটুকুর জন্যও যে এখন সময়ের বড় অভাব! পুরো সফরে বেশ কয়েকবার এ দৃশ্য দেখা সুযোগ হয়েছে। মুদির দোকানী, জাওয়ালে সঞ্চয় প্রেরণকারী, সব্জির চারা বিক্রেতা, যার সঙ্গে যতটুকুই লেনদেন হয়েছে, মাওলানা ফায়রোযকে তারা মনে রেখেছেন। বহুবার দেখেছি, শুধু হাসিমুখের আন্তরিক একটি সালামে মানুষ কত আপন হয়ে ওঠে, সামান্য একটু সদাচারে মানুষ কত বিগলিত হয়! কিšুÍ অত অবসর কোথায় আমাদের! মাওলানা ফায়রোয আদীব হুযূরের আখলাকের এ দিকটা বেশ ভালো শিখেছেন। আল্লাহ তাকে, আমাকে এবং সবাইকে ভরপুর তাওফীক দান করুন; আমীন।***ফজরের পর আমরা রওয়ানা হলাম বালুখালি মুহাজিরশিবিরের উদ্দেশ্যে। তখন আব্বুর সঙ্গে কথা হল। তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশা দিলেন, আর স্মরণ করিয়ে দিলেন সফরের শুরুর নছীহতগুলোর কথা। আগের সফরে আমাদের কাফেলাকে এ পথে কিছু ‘হালাতে’র সম্মুখীন হতে হয়েছিল; আলহামদুলিল্লাহ, এবার আল্লাহ নিরাপদেই রেখেছেন। বালুখালি পানবাজারে পৌঁছে প্রথম কাজ হলো চকোলেট সংগ্রহ করা। এটা হল মুহাজির শিশুদের জন্য আমার ভাগিনা-ভাগিনী আফনান ও নাযরানার হাদিয়া। সফরের কয়েকদিন আগে, ভাইবোন নীরবে নানার কাছে এল দুটি খাম হাতে। ঈদের সময় পাওয়া হাদিয়া। খরচ করেনি, রেখে দিয়েছে মুহাজির শিশুদের জন্য। ওদের ছোট্ট মনের আকুতি, মুহাজিরদের খিদমতে ওরাও শরিক হবে। কেউ তাদের বলে দেয়নি। তবে যুগ যুগের সত্য হলো, ‘মুহাব্বত খোদ সিখাতি হ্যয় আন্দাযে মুহাব্বাত।’ আল্লাহ কবুল করুন, আমীন। পানবাজার থেকে আধাঘন্টার পাহাড়ী পথ পাড়ি দিয়ে ‘ক্লান্ত শ্রান্ত’ হয়ে আমরা নির্ধারিত স্থানে পৌঁছলাম। লজ্জাই পেতে হল! আমার পাশ দিয়েই কী স্বচ্ছন্দে হেঁটে যাচ্ছে মুহাজির শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ! তাদের তো কোন কøান্তি নেই! নাকি ক্লান্ত হওয়ার ‘সুযোগ’ নেই!খবর পেয়ে মক্তবের মাওলানারা এগিয়ে এসেছিলেন। পথেই দেখা হল। আমাদের দেখে, মনে হল তাদের বিষণœ চেহারা উদ্ভাসিত হল। তাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ‘মাদানী’ মসজিদে প্রবেশ করলাম। আমাদের আসার খবর ততক্ষণে পৌঁছে গেছে চার পাহাড়ে। অনেকেই ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাদের সালাম ও মুসাফাহার আকুতি সব সময়ই দেখার মত। তাদের ক্ষুধার্ত মুখম-লে আনন্দের যে উদ্ভাস, প্রতিবারের মত এবারও আমাদের বেশ লজ্জা ও সঙ্কোচে ফেলে দিল। প্রয়োজনের তুলনায় কত সামন্য আমদের খেদমত! এই সামান্যকেই কত আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাদের বরণ, ছোট থেকে বড় ও বুড়ো, সবারই মধ্যে কী আশ্চর্য কৃতজ্ঞতা ও কৃতার্থতা!! এমনকি ঐ যে ছোট্ট শিশুটি, হাতে একটামাত্র চকোলেট, কিন্তু মুখের হাসিটি! যেন তার হাতে সাত রাজার ধন!! আহ, এখানে কেন যে মনে পড়ে গেল, রাজধানী ঢাকার ঐ ছেলেটির কথা! অনেক আদর করে, অনেক ভালোবেসে তাকে চকোলেট দেয়া হল, আর সে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘একটকার চকোলেটে কী হইব!’ আমাদের নির্ধারিত এলাকায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল প্রতিটি ‘ঘরের’ আশেপাশে বেড়ে ওঠা পেপেগাছগুলো। কয়েকমাস আগে প্রতিটি পরিবারে আমরা লাউ আর পেপের চারা বিতরণ করেছিলাম। আলহামুদলিল্লাহ, প্রতিটি গাছ এখন ফলে ফলে সমৃদ্ধ। দেখে সত্যি সত্যি চক্ষু শীতল হল, প্রাণ জুড়িয়ে গেল! আব্বুকে জানালাম তাঁর ‘সব্জীবিপ্লবে’র ‘স্বপ্ন-সফলতার’ কথা। মুহাজিরীনের মধ্যেও কী উচ্ছ্বাস! পেপেগাছে তাদের কত উপকার হল! কার গাছে কয়টি পেপে! কার ‘ঘরে’ আজ পেপে রান্না হয়েছে! কে কী পরিমাণ পেপে বাজারে নিয়ে কত অর্থ আয় করেছে, সবিস্তারে শুনিয়ে তবেই যেন শান্তি! মনে পড়ে, আব্বু প্রথমবার যখন আমাদের বললেন তাঁর সব্জীচারা বিতরণের চিন্তার কথা, আমরা তো অবাক! এটা কি সম্ভব? মুহাজিরীন কি আগ্রহের সঙ্গে নেবেন? আরো কত দ্বিধা-প্রশ্ন! কিন্তু আজ! আব্বু জিজ্ঞাসা করলেন, কী পরিমাণ চারা বিতরণ করা হয়েছে? বুঝলাম, আবার তিরস্কারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন! ঘটনা হল, তিনি বলেছিলেন অন্তত চারলাখ টাকার চারা বিতরণ করার কথা। আমাদের বুঝে আসেনি। ‘কারণ তিনি ঘরে, আমরা মাঠে!’ বারবার ভুলে যাই, তিনি দূরে থেকেও কত কাছে! আমরা এখানে এসেও যা বুঝতে পারি না, ফিরাসাতগুণে- যাকে ভয় করতে বলা হয়েছে- তিনি ওখান থেকে তার চেয়ে অনেক বেশী বোঝেন এবং তাঁর বুঝ হয় অনেক বেশী বাস্তব! তাঁর কথার অন্যথা করে বারবার হোঁচট খাই, তারপরো কেন যে তাঁর চেয়ে বেশী বুঝে ফেলি!আমার কাছে যেমন কোন উত্তর ছিল না, তেমনি ছিলো না মাওলানা ফায়রোযের কাছে। আব্বু তখন নিজে থেকেই বললেন, যা কয়েকবার বলা হয়েছে, যদি আরো পঞ্চাশ হাজার চারা তখন বিতরণ করতে,ঘরে ঘরে আজ তাহলে কত সব্জি পৌঁছে যেত!! আমাকে বল, এই মানুষগুলোর বঞ্চনার দায় কে নেবে? কেন আমার কথা বুঝতে চাও না! না বুঝেও তো পালন করা যায়, শুধু বিশ্বাস ও আস্থা থেকে!***আগেই বলেছি, টেকনাফের বিস্তীর্ণ পাহাড়ী এলাকায় গড়ে উঠেছে মুহাজিরশিবিরগুলো। প্রায় সমউচ্চতার এই পাহাড়গুলোর চূড়ায়, ঢালে এবং পাদদেশে তৈরী করা খুপড়িতে মুহাজিরীনের বসবাস। প্রতিটি পাহাড়ে মোটামুটি শতাধিক পরিবার এবং তাদের দায়িত্বে রয়েছেন একজন মাঝি বা সরদার, যিনি সব বিষয় দেখভাল করেন এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন।***সাধ্যের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় রেখে খিদমতের জন্য চারটি পাহাড় নির্বাচন করা হয়েছে। এভাবে চার পাহাড়ের প্রায় পাঁচশ পরিবারে গত এক বছর ধরে যখন যতটুকু সম্ভব মাদরাসতুল মদীনাহর পক্ষ হতে ‘খিদমত’ বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে! এখানে একটি কথা বলার, ভিতর থেকে আকুতি অনুভব করছি, যাতে বোঝ যাবে, মুহাজিরীনের প্রতি আমার আব্বুর, আমাদের আদীব হুযূরের অন্তরে কী পরিমাণ দরদ-ব্যথা ও চিন্তা-ফিকির রয়েছে। প্রথমে আমাদের কাফেলার কর্মক্ষেত্র ছিলো তিনটি পাহাড়ের চারশ পরিবার! এর মধ্যে আব্বুর ভাষায়, ‘আমার পুত্র’ আব্দুল্লাহ আরাকানী দুনিয়াতে এলো, গত সফরনামায় যার কথা বলেছি! তো আব্বুকে বললাম, আব্দুল্লাহ আরাকানীকে দেখতে যাই, ওর মা-বাবার হাতে কিছু অর্থ দেই। অন্যরা দেখে, দেখেই থাকে! এরূপ সর্বগ্রাসী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য সত্ত্বেও কিছু বলে না! কিছু চায় না! নিজেকে তখন বড় অপরাধী মনে হয়। যদি সম্ভব হত এই পাহাড়টিকেও খিদমতের আওতায় নিয়ে আসা! একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, বাবা, ইচ্ছে তো হয়, প্রাণের আকুতি তো এইা যে, সমগ্র শিবিরে ছড়িয়ে পড়ি! কিন্তু ...!! ফোনের অপর প্রান্তে কিছুক্ষণ নীরবতা! তারপর আমার বাবার ব্যথাতুর কণ্ঠস্বর, নতুন একটি পাহাড় অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হবে আরো একলাখ টাকা!আমি বললাম, তাহলে এক কাজ করি, আব্দুল্লাহ আরাকানীর জন্য ওখানে আর না যাই! আব্বু বললেন, বাহ, কী সুন্দর ‘ইমোশনাল ব্লাকমেইল’! ঠিক আছে, আল্লাহ ভরসা। ঐ পাহাড়টিও অন্তর্ভুক্ত কর। এই হলেন আমার বাবা! আমার বন্ধু!! আমার অভিভাবক!! এই হলেন আমাদের আদীব হুযূর। কখনো মনে হয়, সন্তানের মুখে বাবার...কতজন কত কিছু ভাবতে পারে! তখন মনে পড়ে, এরূপ এক প্রসঙ্গে বাবা আমাকে বলেছিলেন, মানুষ তোমার সম্পর্কে কী ভাবছে, এ চিন্তাটা বিলকুল ছেড়ে দাও। বরং চিন্তা কর, তুমি নিজের সম্পর্কে কী ভাবছ! তার চেয়ে বড় কথা, বরং সবচে’ বড় কথা, চিন্তা করো, তোমার আল্লাহ তোমার সম্পর্কে কী ভাবছেন!আসলে আমারও ছোট্ট হৃদয়ে আছে কিছু অব্যক্ত ব্যথা! আদীব হুযূরের একজন ছাত্রও -অন্তত আমার দেখার মধ্যে- তাঁকে কদর করেনি। তাঁর চিন্তা-চেতনা, ভাব-ভাবনা, দরদ-ব্যথা, না নিজেরা গ্রহণ করেছে, না পরবর্তীদের জন্য সংরক্ষণ করেছে। নিজের সাধ্যের সীমাবদ্ধতা সত্তেও আমি চাই, মুখে ও কলমে, তারও আগে জীবনের আচারে আচরণে আমার আব্বুকে, আমাদের আদীব হুযূরকে গ্রহণ করবো, বরণ করবো এবং পরবর্তীদের জন্য তাঁকে সংরক্ষণের চেষ্টা করবো। আল্লাহ জানেন, তিনি আমার বাবা না হলেও এটা আমি করতাম; আমার সাধ্যমত করতাম।***আল্লাহর শোকর, আমার বাবার ‘দুর্বলতা’ আমার মধ্যেও ‘অধিষ্ঠান’ লাভ করেছে! প্রসঙ্গ থেকে বহুদূরে চলে যাওয়া এবং পথ হারিয়ে ফেলা!তখন আগের জায়গায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে লেখার আয়তন হয়ে পড়ে স্ফীত।চার পাহাড়ে মুহাজির শিশুদের তালীমের জন্য আলহামদুলিল্লাহ, তিনটি মক্তব এবং একটি হেফযখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে তেরো জন উস্তাযের অধীনে প্রায় পাঁচশ মুহাজির শিশু - ছেলে মেয়ে- তালীম নিচ্ছে। এই কঠিন প্রতিকূলতার মধ্যেও আরাকানী মাওলানাগণ আলহামদুলিল্লাহ, কোরবানীর পথ ধরে অনেক মেহনত-মুজাহাদা করছেন।আদীব হুযূর সাধ্য অনুযায়ী তাদের ‘খেদমতে’র চেষ্টা করে যাচ্ছেন। প্রতিবার এই শিশুদের জন্য তিনি আলাদাভাবে কিছু হাদিয়া দিয়ে দেন যা তাদের আগ্রহ উদ্দীপনা ধরে রাখা এবং বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। হাদিয়াটা আমরা এই শিশুদের হাতেই অর্পণ করি। তাই আমাদের দেখতে পেলে ওদেরও অন্তরে খুশি ও আনন্দের শিশুসুলভ অভিপ্রকাশ ঘটে। কিছু সময়ের জন্য ওরা যেন ভুলে যায়, কোথায় কী অবস্থায় ওরা আছে! আমরা সবসময় চেষ্টা করি, মুহাজিরদের ডেকে একস্থানে জড়ো না করে প্রত্যেক ঘরের দরজায় গিয়ে সালাম দিয়ে মর্যাদার সঙ্গে ‘তাদের হক’ তাদের হাতে পৌঁছে দিতে। বিশেষভাবে চেষ্টা করা হয় পরিবারের মহিলা সদস্য (মা-স্ত্রী-মেয়ে)-এর হাতে তুলে দিতে। যদিও জানি একটু পরেই মালিকানা তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এটা আমাদের পক্ষ হতে ‘নারিমর্যাদা’ প্রকাশের ক্ষুদ্র একটা প্রয়াস। তাছাড়া নারিদের গ্রহণের শোকর ও সৌন্দর্য অনেক বেশী। আড়াল থেকে ক্ষীণ কণ্ঠের বিসমিল্লাহ এবং অকৃপণ দোআ থেকে তা অনুভব করা যায়। এবারও তাই করা হল। এতে অবশ্য সময় ও পরিশ্রম বেশী। কিন্তু মুহাজিরীন কষ্ট ও অমর্যাদা থেকে রক্ষা পান। বিশ্বাসে দুর্বলতা যদি থাকেও, অন্তত আচরণে আমরা এটা প্রকাশের চেষ্টা করি যে, আমরা আনছার, তারা আমাদের মুহাজির ভাই। তাদের পাশে দাঁড়ানো যতটা না তাদের প্রয়োজনে তারচেয়ে অনেক বেশী আমাদের প্রয়োজনে। শুধু এটুকু অনুভূতির মাধ্যমে দানে দানে যেন আসমান যমীনের পার্থক্য হয়ে যায়!***সিদ্ধান্ত হল, আমি দুই পাহাড়ে বিতরণ করব, আর বাকি দুই পাহাড়ের দায়িত্ব মাওলানা যায়েদ পালন করবেন। মাওলানা ফায়রোজ মক্তবের তালীম তারবিয়াত দেখবেন এবং শিশুদের হাদিয়া শিশুদের হাতে পৌঁছে দেবেন। বিসমিল্লাহ বলে আমরা বিতরণের কাজ শুরু করলাম। প্রথমে হাজির হলাম আবদুল্লাহ আরাকানীর দুয়ারে। আশা করি, পাঠকের মনে আছে ‘আমার’ আবদুল্লাহ আরাকানীর কথা। ওকে কোলে নিয়ে, মনের পর্দায় ভেসে উঠলো গায়বের কত সব কারিশমা! নয় মাসের আবদুল্লাহ-কে গর্ভে নিয়ে অকল্পনীয় এক অভিযাত্রায় আরাকান থেকে তার মায়ের বাংলাদেশে আগমন! সেদিনই শুধু কাজশেষে ফিরতে আমাদের বিলম্ব হওয়া। দুই পাহাড়ের মাঝখানে, গিরিপথে, সাঁঝের আঁধারে, প্রসববেদনায় কাতর স্ত্রীকে নিয়ে দিশেহারা আবু আব্দুল্লাহর সাথে আমাদের দেখা হয়ে যাওয়া। চরম দুঃশ্চিন্তা আর আশঙ্কায় অতিবাহিত হওয়া আমাদের সেই রাতটি! পরদিন দুরুদুরু বুকে আবদুল্লাহদের দরজায় আমাদের উপস্থিতি এবং তারপর আমাদের মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে ঘর থেকে ভেসে আসা ‘জান্নাতী সংগীত’। (আহ! কান্নার আওয়াজেও থাকে এত প্রশান্তি!) তারপর শিশুটিকে কোলে নিয়ে তার মায়ের অনুরোধে আমার জীবনে প্রথম কোন শিশুর নাম রাখা। মনে হয় সবই যেন গতকালের কথা! কিন্তু না ইতিমধ্যেই পার হয়ে গেছে পূর্ণ একটি বছর, তিনশ পঁয়ষট্টিটি দিন!। সেই শিশুটির বয়স এখন পূর্ণ এক বছর। আমার কোলে বসে কিছুক্ষণ অবাক দৃষ্টি মেলে আমাকে দেখল আবদুল্লাহ। হয়ত চিনল, হয়ত চিনল না; তবে মধুর একটি হাসি উপহার দিল আমাকে, তারপর ফিরে গেল মায়ের কোলে। ওর জন্য এবং ওর মায়ের জন্য আলাদা করে নিয়ে যাওয়া কিছু হাদিয়া তুলে দিলাম ওর মায়ের হাতে। আবদুল্লাহর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে গেলাম অন্য ঘরগুলোর দিকে। মুহাজিরদের দুয়ারে দুয়ারে হাজির হয়ে ‘কাগজের টুকরো’টি তাদের হাতে তুলে দিলাম। প্রতিটি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখা গেল ঝুপড়িগুলোর বিরান অবস্থা। ছেঁড়া, ময়লা একটা চাদর কোন ঘরে আছে, কোন ঘরে নেই। এই ‘ভ্যাপসা’ গরমের মধ্যে দুধের শিশুটি, কোলের শিশুটি ‘পড়ে’ আছে মাটিতে। ‘কিছ’ু একটা দিয়ে বাতাস করে তাকে একটু আরাম দেয়ার চেষ্টা করছেন মা। আর তার নিজের অবস্থা! অল্প কিছু সময় পাহাড়ে অবস্থানকালে আমাদের যে অবস্থা হয়! ভাবলেই যেন চোখ অন্ধকার হয়ে আসে, এই পরিবেশে কিভাবে বেঁচে আছেন তারা? আবার বৃষ্টিতেও স্বস্তি নেই। একটা ভারী বর্ষণেই শুরু হয় পাহাড়ধ্বস। তার উপর তো আছে ক্ষুধা পিপাসার যন্ত্রনা! এই কষ্টের জীবন একদিন শেষ হবে, এই আশাতেও কষ্ট হয়ত কিছুটা লাঘব হত কিন্তু সেই সান্ত¡নাও তো নেই তাদের জীবনে! ঘরের বৃদ্ধ বৃদ্ধাটি দেখলাম পড়ে আছে আরেক কোণে শূন্য দৃষ্টি মেলে। শহরের সচ্ছল ঘরে, অন্ন বস্ত্রের যেখানে অভাব নেই সেখানেই যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে, এখানে তাহলে কি ঘটতে পারে! কর্মক্ষম ‘পেট’গুলোই যেখানে দিন কাটাচ্ছে অনাহারে! একবার ইচ্ছে হল জিজ্ঞাসা করি, কিভাবে তারা বেঁচে আছেন? কী খেয়ে পার হচ্ছে তাদের দিন? কিন্তু মনে হল, এতে তো তাদের কষ্টটাই আরো ... । রোহিঙ্গাদের দুর্বিষহ জীবন এবং ক্ষুধা অনাহারের যন্ত্রনা, এসব এখন আমাদের পত্র পত্রিকার জন্য ‘বাসি খবর’। জাতিসঙ্ঘ বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা অবশ্য ‘প্রতিবেদনকূটনীতি’ চালিয়ে যাচ্ছে। এই তো সেদিন খবর এল, জাতিসঙ্ঘের কোন সংস্থা দিনের আলোতে সারা বিশ্বের চোখের সামনে ঘটা করে ঘোষণা দিলো, রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত গণহত্যা ও জাতিগত উচ্ছেদের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে দীর্ঘ এক বছরের তদন্ত শেষে! সে জন্য দায়ী মগজেনারেলদের বিচারের জোরালো দাবী জানান হয়েছে। সবাই জানে, এগুলো রোহিঙ্গাদের নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কিছুই না। প্রতিটি নির্যাতিত মুসলিম জনপদ নিয়েই চলছে ওদের এই তামাশা। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার নাটক হয়ত চলবে আরো কিছুদিন। এসব নীরবে দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছু হয়ত আমাদের করার নেই। কিন্তু আমাদের যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, তাদের কিছুটা কষ্ট লাঘবের চেষ্টা তো আমরা করতে পারি! একজন মাজলূমের, একটি মাজলূম পরিবারের ক্ষুধা অনাহারের যন্ত্রণা দূর করার চেষ্টায় আমি শরিক তো হতে পারি! কিন্তু আমরা তো হায়...! তুরস্ক নিজেই তো পেরেশান তার ভূখ-ে আশ্রয় নেয়া ত্রিশ লাখের বেশী সিরীয় মুহাজিরীন নিয়ে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেখি, তুরস্ক কত দরদের সঙ্গে, অন্তরঙ্গতার সঙ্গে সম্মানজনক-ভাবে মুহাজিরীনের খেদমত করছে। তুরস্ককে আল্লাহ আরো তাওফীক দান করুন। নিজের দেশে বিপুল পরিমাণ মুহাজিরীনের খেদমত তো করছেই, এমনকি এই দূরদেশের রোহিঙ্গাদের সাহায্যে সবার আগে তারাই এগিয়ে এসেছে এবং পরিমাণে ‘খেজুরওয়ালাদের’ চেয়ে হাজারগুণে বেশী! মুহাজিরশিবিরে বিশাল এলাকাজুড়ে স্থায়ীভাবে চলছে তাদের বহুমুখী সেবাকার্যক্রম। কিন্তু আফসোস রোহিঙ্গাদের বিষয়ে অনেক কষ্টে পাওয়া ভারতের সামান্য ‘লিপসার্ভিস’ যতটা প্রচার পায় তুরস্কের বিপুল কর্মযজ্ঞের ক্ষেত্রে তার ভগ্নাংশও দেখা যায় না।***দিনটি ছিল শুক্রবার। জুমার আগেই বিতরণ সমাপ্ত করে আমরা মসজিদে ফিরে এলাম। আমাদের সফরসঙ্গী (আমার সেঝ চাচা) ‘গাযী’ ছাহেব খুব অভিভূত হলেন লোকবলের স্বল্পতা (তিন জন) এবং কাজের পরিধি ও শৃঙ্খলা দেখে। একবছর আগে তিনি এসেছিলেন তার এলাকার (দাওয়াত ও তাবলীগের) সাথীদের নিয়ে । তিনি বললেন আমরা বিশ পচিশজন এসেও হিমশিম অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু এখানে তো আলহামদু লিল্লাহ...। বললাম, জ্বী, আল্লাহ অনেক সাহায্য করছেন। খেদমতে খালক্বের এ কাজের কল্পনা ও পরিকল্পনা তো আব্বুর আজকের নয় এবং নয় কোন আকস্মিক পরিস্থিতির ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। এটা তো তাঁর মাক্বছাদে হায়াত, যিন্দেগীর মিশন। সঙ্গিদের ‘সঙ্গ’ যদি তিনি পেতেন তাহলে অনেক আগেই আরো অনেক কিছু সম্ভব হত। তবে যা হয়েছে যতটুকু হয়েছে তার জন্যই তিনি সবসময় আল্লাহর শোকর আদায় করেন এবং আল্লাহ কাছে আরো তাওফিক প্রার্থনা করেন।***মুছল্লিতে মসজিদ তখন পরিপূর্ণ। মাত্র দু’ঘন্টা পাহাড়ে বিচরণ করে আমাদের এই কাহিল অবস্থা! তাদের সামনে দাঁড়াতেই সঙ্কোচ হচ্ছে। আমরা তো একটু পরেই বিদায় নেব, কিন্তু কোথায়, কী পরিবেশে তাদের ফেলে যাব? আল্লাহ তাদের সহায় হোন এবং আমাদের তাওফীক দান করুন সাধ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর, আমীন।মসজিদের পাশে স্থাপিত গভীর নলকূপের ঠা-া পানিতে অযু করে আমরা ‘শীতল’ হলাম। মুহাজিরীনের জন্য সুপেয় পানির এই এন্তেজাম করতে কিছুদিন আগে আমাদের একটি খিদমাতি কাফেলা এসেছিলো। চার পাহাড় ছাড়াও দূরের বহু মানুষও আলহামদুলিল্লাহ, বেশ উপকৃত হচ্ছে। মসজিদের বিদ্যুৎ এবং পানির মটর সচল রাখার জন্য আলহামদুলিল্লাহ একটি ‘বিদ্যুতিকার’ও ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতটুকু অনেকেই করেছে। যা করা হয়নি, আব্বু দূর থেকেই তার প্রয়োজনীয়তা বুঝেছেন এবং সেভাবে ব্যবস্থা নিয়েছেন। ঘটনা এই যে, প্রথমে নলকূপ বসানো হয়েছিলো আমাদের পক্ষ হতে এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার পক্ষ হতে। কিছুদিন পর দেখা গেল, পানি ওঠে না। তখন গভীর নলকূপ বসানো হয়; আর বিদ্যুতিকার জ্বালানীর জন্য ‘সামান্য’ পরিমাণ করে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই সামান্য যে এ মানুষগুলোর জীবনে কত কষ্টের সামান্য, তা বোঝার জন্য আসলেই দরকার দরদী হৃদয়। আব্বুর নির্দেশনায় না বুঝেও আমরা জ্বালানীর জন্য মাসিক বরাদ্দ দিয়েছি। তাই দেখা যায়, জ্বালানীর অভাবে বহু গভীর নলকূপ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, আর আলহামদু লিল্লাহ, আমাদের মসজিদের তত্ত্বাবধানে গভীর নূলকূপ পূর্ণ সচল রয়েছে। এ বিষয়ে আব্বুর বাক্যটি হল, ‘ওদের কাছে এখন -হোক পানির জন্য- একটাকা চাঁদা দেয়ার চেয়ে জান দেয়া সহজ। সুতরাং ঐসব ‘উর্বর’ চিন্তা এখন মাথায় আনার দরকার নেই।’ একজন আরাকানী মাওলানা খুব আবেগের সঙ্গে বললেন, আপনার আব্বা তো ‘ফেরেশতা ইনসান’। এক নযর তাঁকে যদি দেখার সৌভাগ্য হত! কতদূর থেকে তিনি আমাদের কথা এভাবে ভাবছেন। শুধু এই এক পানিই তো ইনশাআল্লাহ তাঁর জান্নাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে! আল্লাহ যেন কবুল করেন, আমীন। বিপদগ্রস্ত মানুষের মুখে বাবার জন্য এরূপ দু‘আ সন্তান হিসাবে শুনতে ভালো লাগতেই পারে!***আমাদের চারা বিতরণের কাজ এখনো বাকি। বেশ কিছু চারা এসে গেছে। মুহাজির ভায়েরাই ‘চারাক্ষেত্র’ থেকে বহন করে আনছেন। আমাদের- এবং অন্যদেরও- চিন্তা স্বেচ্ছাশ্রম থেকে আগে বাড়ে না। কিন্তু আব্বু আদেশ দিয়েছেন বহনকারী -দের খুশী করার, যাতে তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও শ্রম ও পারিশ্রমিকের মর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়, এ মুহূর্তে যার খুবই প্রয়োজন। ইচ্ছে ছিল নামাযের আগেই বিতরণ সমাপ্ত করার; সম্ভব হল না। আব্বু কী কারণে যেন ‘জোর’ দিয়ে বললেন, নামাজের পর যতদ্রুত সম্ভব আমরা যেন রওয়ানা হয়ে যাই। ইতিমধ্যেই অন্যান্য পাহাড় থেকে কিছু মানুষ উপস্থিত হয়েছেন আমাদের খবর পেয়ে। অনেক আশা নিয়ে আসা মানুষগুলোর ব্যাকুল দৃষ্টি দেখে কত যে কষ্ট হয়! কিন্তু সীমাবদ্ধ-তার কারণে ‘নীরব’ থাকা ছাড়া কোন উপায় থাকে না আমাদের! তবে আমাদের যেটা অবাক করেছে এবং আপ্লুত তা এই যে, মুখে তারা তেমন কিছু বলছে না। যা বলার বলছে শুধু তাদের ঘোলা চোখের নীরব দৃষ্টি। মাওলা গো, তুমি তো সবই দেখ। গায়ব থেকে পাঠিয়ে দাও না আরো সাহায্য! জুমার পর অল্প সময়ে আমরা কিছু চারা বিতরণ করলাম, আর বাকিগুলো আরাকানী মাওলানাদের হাতে অর্পণ করে এলাম। তারাই ইনশাআল্লাহ ঘরে ঘরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করবেন। আব্বু বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন, বিভিন্ন কাজে আমরা যেন চেষ্টা করি আরাকানী মাওলানাদেরকেই সামনে রাখতে এবং তাদেরও উৎসাহিত করি, যেন তারা সবসময় তাদের ক্বাওমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না থাকেন। অনেক আগেই যে বিষয়ে তাদের সতর্ক ও সচেষ্ট হওয়া উচিত ছিল (এবং আমাদেরও) তা তো হয়নি, অন্তত এখন যেন এই বিষয়ে আর অবহেলা না হয়। আলহামদুলিল্লাহ তাদের মধ্যেও কিছুটা চাঞ্চল্য ও চেতনা এসেছে এবং আহলে ইলমের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কিছু সুপ্রভাব এই ছোট্ট পাহাড়ী সমাজে অনুভূত হচ্ছে। এক ‘মাঝি’ খুব আনন্দের সাথে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ, গত কয়েকমাসে আমাদের এই এলাকায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। প্রশাসনের লোকেরাও এটা অনুভব করেছেন এবং খুশি প্রকাশ করেছেন। ***জুমার পর এবারের মত আমাদের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এল। রওয়ানা হওয়ার আগে মাওলানা ফায়রোয আরাকানী মাওলানাদের উদ্দেশ্যে কিছু তারগীবী কথা বললেন এবং তালীমের বিষয়ে তাদের জরুরী কিছু পরামর্শ দিলেন। মক্তবের শিশুদের মাঝে এবার আমরা আলহামদুলিল্লাহ, আগের চেয়ে বেশী শৃঙ্খলা এবং আগ্রহ দেখতে পেয়েছি। সেটা উল্লেখ করে আমরা উস্তাযদের শোকর আদায় করলাম। আমাদের মক্তবের পাঁচশ শিশুর প্রায় সবাই আলহামদুলিল্লাহ নিয়মিত দরসে হাজির হচ্ছে এবং সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হল, ‘নির্ভয়ে’ হাসি ও আনন্দের মধ্যেই এগিয়ে চলেছে তাদের পড়ালেখা। এই পাহাড়ের মধ্যেও ‘বেতহীন’ একটি মক্তবের নমুনা আল্লাহ কায়েম করে দিয়েছেন। তবে শুরুতে অবশ্য ‘আরাকানী হুযূরদের’ এটা বোঝাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। আলহামদু লিল্লাহ তারাও এখন মনে হল কিছুটা বুঝতে পারছেন, একটু আদর, মায়া এবং একটি ‘চকোলেটে’র সুফল কত! বেশ কয়েকজন শিশুর পড়া ও তেলাওয়াত শোনারও সুযোগ হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকার জন্যই প্রতিনিয়ত তাদেরকে যে সংগ্রাম করতে হচ্ছে তার মধ্যেও যে এতটুকু হয়েছে তা অবশ্যই আল্লাহর অনেক বড় দয়া।***তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ‘তুর্কীপল্লী’র উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমাদের পাহাড় থেকে বিশ মিনিটের পথ। দূর থেকেই আমাদের স্বাগত জানালো তুরস্কের ‘চাঁদতারা’। বর্তমান সঙ্কটের শুরুতেই তুরস্ক ঘোষণা দিয়েছিল, রোহিঙ্গা মুহাজিরীনের সার্বিক বিষয়ে যে কোন প্রয়োজনে তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে থাকবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মঞ্চে সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করছে তুরস্ক এবং মাঠ পর্যায়েও বিপুল খেদমত অঞ্জাম দিয়ে চলেছে। মুহাজিরীনের জন্য হাজার হাজার অস্থায়ী ঘর তৈরির এক বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তুরস্ক এবং ইতিমধ্যেই বহু ঘর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। পাকা মেঝেবিশিষ্ট ঘরগুলোতে নির্মাণকারিদের যত্ন ও আন্তরিকতার ছাপ স্পষ্টই বোঝা যায়। পুরো এলাকাজুড়ে সুপেয় পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন ‘স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র’ স্থাপনের পাশাপাশি দুটি হাসপাতাল স্থাপনেরও উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। তুর্কী পল্লীতে মুাহাজির শিশুদের জন্য বিদ্যালয়, বয়স্কদের জন্য আলাদা আশ্রয়কেন্দ্র, পরিবারের বিচ্ছিন্ন সদস্যদের সন্ধান করে একত্র করার প্রচেষ্টা, বিধবাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং এ জাতীয় আরো অনেক কর্মসূচি অল্পসময়ের পরিদর্শনে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তুরস্ক সরকারের পাশাপাশি বহু তুর্কী বেসরকারি সংস্থাও নিয়োজিত রয়েছে মুহাজিরীনের সেবায়। মুহাজিরীনের জন্য সাহায্যসংগ্রহে তুরস্কেও তারা নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছেন। তুর্কী জনগণও ব্যাপক সাড়া দিচ্ছে তাদের আহ্বানে। অন্যান্য সচ্ছল মুসলিম দেশগুলো যখন চরম নির্লিপ্ততার পরিচয় দিচ্ছে তখন ‘খারাপ তুরস্কের খারাপ নেতা’ রোহিঙ্গা মুহাজিরীনের খেদমতে এভাবেই এগিয়ে এসেছে। আমরা যদি এজন্য ভুলে একটু প্রশংসা করে ফেলি, আশা করি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে।তুরস্কের ভূমিতে আশ্রয়গ্রহণকারী সিরীয় মুহাজিরীন ও বাংলাদেশে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গা মুহাজিরীনের ক্ষেত্রে যেমন তেমনি বিশ্বের নানাপ্রান্তের নির্যাতিত মুসলিম জনগোষ্ঠিকেও রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সর্বপ্রকারে যথাসাধ্য সাহায্য করে চলেছে তুরস্ক। তাই স্বাভাবিক কারণেই শত্রুর চতুর্মূখী হামলার শিকার হতে হচ্ছে তুরস্ক ও তুর্কী জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতাকে। বিশেষ করে গত কয়েকটা মাস দুশমন যেন একেবারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমেরিকার অর্থনৈতিক আক্রমণের মুখে নিঃসঙ্গ তুরস্ক এখনঅত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু তার মাধ্যেও মুহাজিরীনের জন্য তুরস্কের খেদমত অব্যাহত রয়েছে প্রায় একই মাত্রায়। আল্লাহতুরস্ক ও তুরস্কের ‘তায়্যিবে’র সহায় হোন।***এবারের মত আমাদের কাজ সমাপ্ত করে সন্ধ্যায় আমরা মুহাজিরশিবির থেকে টেকনাফে ফিরে এলাম। আগমীকাল ভোরে ইনশাআল্লাহ আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হব। বালুখালি থেকে টেকনাফে ফেরার পথে একটি নিরাপত্তা চৌকিতে সেনাবাহিনীর ভাইদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলার ‘সুযোগ’ হল। সাদা লেবাসের কিছু মানুষ ‘পূণর্’ সালামের সঙ্গে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে, এটা তাদের কাছে ভালো লেগেছে বলে মনে হল। বিদায়ের সময় মুখেরও তারা প্রকাশ করলেন, ‘আপনাদের সাথে কথা বলে আমাদের ভালো লেগেছে’। আমরাও তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম ‘অনেক বাধা বিপত্তি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও আপনারা অনেক করছেন। আল্লাহ আপনাদের আরো তাওফিক দান করুন, আমীন।’ সবকিছু সুন্দরভাবে সমাপ্ত হওয়ায় আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করলাম। গত এক বছরে কক্সবাজার থেকে টেকনাফের পথে এবং টেকনাফের পথে পথে ‘পরিস্থিতি’ মোকাবেলায় বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক অনেক নিরাপত্তাচৌকি স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় তাদের সঙ্গে আমাদের কথা বলারও ‘সুযোগ’ হয়েছে। সেখানে ‘ইউনিফর্ম’-এর ভিন্নতার সঙ্গে আচরণের বিস্ময়করবিভিন্নতাও আমরা দেখতে পেয়েছি। শুভ্র পোশাকের প্রতি অনেক শ্রদ্ধা যেমন দেখেছি তেমনি...। তবে তিক্ত সত্য এই যে, আমাদের কাজের প্রতিকূলতা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। আমরা কাজ করি না, এটা যেমন শুনতে হয়, তেমনই সামান্য কিছু করতে গেলে প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হয়। তবে এর মধ্যেই তো আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। মাদরাসাতুল মাদীনাহর খেদমতে খালক্বের কাজকে আরো সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে আদীব হুযূর ‘খেদমতে খালক ফাউ-েশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেছেন। আল্লাহর এক বান্দার দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টার পর- যার নাম এখানে অনুক্তই রাখা হল- অনেক প্রতিকূলতার মোকাবেলা করে আলহামদুলিল্লাহ এই সেদিন এর সরকারী নিবন্ধনও সম্পন্ন হয়েছে। সুযোগ হলে পরবর্তী সময়ে এ সম্পর্কে কিছু লেখার নিয়ত রয়েছে। আদীব হুযূর চেয়েছিলেন নামের শুরুতে ‘আলেম সমাজে’র এই শব্দটি যোগ করতে। শুধু এ জন্য অপ্রীতিকর জটিলতা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে বাধ্য হয়ে এটা ছেড়ে দিতে হয়েছে। তবে ‘বর্তমান’ প্রতিকূলতার মধ্যেও যতটুকু হয়েছে তার জন্যও আমরা আল্লাহর শোকর আদায় করি। এই অবসরে আমি নিজের পক্ষ হতে দাওয়াত পেশ করছি, মাদরাসাতুল মাদীনাহর খেদমতে খালকের এ আন্দোলন ও মেহনতে সবাই নিজ নিজ সাধ্য-মত শরীক হোক। ইনশাআল্লাহ সবার পক্ষ হতে বিন্দু বিন্দু একত্র হয়ে মহাসাগর তৈরী হতে পারে। তাতে আলেমসমাজের পক্ষ হতে খেদমতে খালকের বিরাট নমুনা ও মেছাল কায়েম হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সব টুটাফাটা মেহনত তাঁর জন্য কবুল করুন, আমীন।